বুধবার ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ ১৭ জুলাই, ২০১৯ বুধবার

সংলাপে সমাধান দেখছে না ঐক্যফ্রন্ট

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: বহুল প্রতিক্ষিত সংলাপের অর্জন নেই বলেই মত দিয়েছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। সভা-সমাবেশ করার ও নতুন রাজনৈতিক মামলা হবে না বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারপরও মাঠপর্যায়ে কতটুকু সুফল ভোগ করতে পারবে বিএনপি, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন নেতারা। তা ছাড়া ঐক্যফ্রন্টের দেওয়া সাত দফার প্রধান দাবিগুলো উপস্থাপন করা হলেও কার্যত সেগুলো উপেক্ষিত হয়েছে সংলাপে। আবার ফ্রন্টের প্রধান দল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সেভাবে উঠে না আসায় দলের মহাসচিবসহ উপস্থিত নেতারা হতাশ হন।

বিরোধীপক্ষের মুখ্য আলোচক ড. কামাল হোসেন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা না বলায় বিএনপিরও সন্দেহ বাড়ছে। এ অবস্থায় বিএনপি নেতারা সংলাপকে শুধু ‘সিটিং’-এর বাইরে অন্য কিছু ভাবতে রাজি নন। ড. কামাল সংলাপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করতে চাইলেও জোটের অন্য নেতারা এমনটা ভাবতে রাজি নন। তারা মনে করছেন, সরকার আগের অবস্থাতেই আছে। সংলাপ শেষে জোটের নেতাদের কথায় এমন চিত্রই উঠে আসে।

ফ্রন্টের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, সংসদ ভেঙে দেওয়া, ইবিএম ব্যবহার না করা, বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলোকে আওয়ামী লীগ গুরুত্ব দেয়নি। বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা বলেন, সংলাপের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী স্বাগত বক্তব্য দেন। তারপর বিরোধী পক্ষের মোট উপস্থিতির ১৯ জনের মধ্যে ১১ জন বিভিন্ন বিষয় একে একে উপস্থাপন করেন। এসব দাবি-দাওয়া উপস্থাপনের ফাঁকে ফাঁকে সরকার অংশের নেতারা বেশ কিছু পাল্টা যুক্তিও তুলে ধরেন। তবে বিরোধী নেতাদের বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী ঘণ্টাব্যাপী আবেঘন বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যের পর মিটিংয়ের পরিবেশ একপেশে হয়ে পড়ে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি তুলে ধরলে এটি আইন ও আদালতের বলে পাশ কাটিয়ে যায় আওয়ামী লীগ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ড. কামালকে উদ্দেশ করে বলেন, খালেদার বিরুদ্ধে মামলাটি আমি করিনি। আর মুক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমার কিছু করার আছে কি না প্রশ্ন করেন ড. কামালকে। প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল কোনো উত্তর দেননি। এ বিষয়ে ড. কামাল চুপ থাকলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তার ভূমিকা পজেটিভ থাকলে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করলেও জোটের অন্য দলের নেতারা এ ইস্যুতে কোনো কথা বলেননি।

তাই বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল জোট নেতাদের এমন ভূমিকার সমালোচনা করতে দেখা গেছে সেগুনবাগিচায় ড. কামালের বাসায়। তা ছাড়া সংলাপ থেকে বের হয়ে ড. কামাল সংলাপ নিয়ে সন্তুষ্ট— এমন বক্তব্য মিডিয়াতে দেওয়ায় রুষ্ট হয় বিএনপি। যদিও মির্জা ফখরুল সংলাপে অসন্তোষের কথা জানান। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে ড. কামালের বাসায় আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। সেখানে ড. কামাল বলেন, ‘আজকের সংলাপে বিশেষ সমাধান আমরা পাই নাই’। তারপর মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে সংলাপ নিয় হতাশার কথা তুলে ধরেন। পরে জোটের অন্যতম নেতা আ স ম রব বলেন, সংলাপে কিছু অর্জন হয়নি। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাব।

সংলাপ শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মিডিয়ার সামনে সাড়ে তিন ঘণ্টার আলোচনার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভোটের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি নাকচ করা হয়েছে এই বলে যে, সংসদীয় গণতন্ত্র রয়েছে, এমন দেশে সংসদ বহাল থাকা অবস্থাতেই ভোট হয়। আর সরকার পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি হয়ে যাওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয় নিয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম এবং আইনের বিষয় কোট করেও বলেছিলাম। পরামর্শ দিয়েছিলাম সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, বর্তমান আইনমন্ত্রী স ম রেজাউল করিমদের সঙ্গে কথা বলে তাকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন। তিনি নির্বাচনে কনটেস্ট করতে না পারলেও নির্বাচনটা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। কিন্তু সেটার বিষয়ে আইনের কথা বলে দিলেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও সেনা মোতায়েন নিয়ে কথা বলা হয়েছে। তারও তেমন কোনো সদুত্তর মেলেনি। সভা-সমাবেশ করার ব্যাপারে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে অনুমতি লাগবে না। কিন্তু সেটা করতে হবে মাঠে বা হলরুমে। রাস্তা আটকে সমাবেশ করা যাবে না। কিন্তু সভা-সমাবেশ করা তো আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। এটা নিয়ে আলাদা করে আশ্বাস কেন দিতে হবে? নতুন করে মামলা হবে নাÑএমনটাও বলা হয়েছে। তবে যারা আটক আছেন, তাদের মুক্তির বিষয়ে তার মনোভাব দেখলাম কঠোর।

সংলাপে অংশ নেওয়া আরেক সদস্য জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সংলাপের কিছু অর্জন আছে। যেমন সভা-সমাবেশ করার ক্ষেত্রে সমস্যা করবে না সরকার, বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন উপলক্ষে কাজ করতে পারবে এসব বিষয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সংসদ ভেঙে দেওয়া তার তো কোনো সুরাহা হয়নি।

তবে সংলাপের প্রতিনিধি সংখ্যার অনুপাত নিয়ে বিএনপি ও ২০ দলের বেশ কয়েকজন নেতা প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাও করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে গণফোরামের সমান প্রতিনিধি বিএনপিরও। বিএনপি থেকে সংলাপে ছয়জন উপস্থিত ছিলেন। আবার সমান সংখ্যা ছিল গণফোরামেরও। এ নিয়ে বিএনপি নেতারা মনে করছেন, জোটে বিএনপিকে গণফোরামের সমান ভাবা যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তাতে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত নেতারা প্রকাশ্যে কোনো কথা বলছেন না।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের দুটি প্রাপ্তিকে মামুলি আখ্যা দিয়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা যে দুটি বিষয়কে প্রাপ্তি মনে করছেন, তা আসলে কোনো প্রাপ্তিই না। সংলাপে সমাধান দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। তার মতে, সংলাপের আগে থেকে সরকারের মনোভাব খুবই পরিষ্কার ছিল। সংলাপ আপতদৃষ্টিতে শেষ। এখন সবাই গণভবনের চা চক্রে আমন্ত্রিত। ফলাফল আসলে শূন্য।

বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপের পর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার কর্মসূচি দিয়েছে ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল নয়া পল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আগামী ৬ নভেম্বর জনসভা করার জন্য ইতোমধ্যে অনুমতি চেয়েছেন তারা। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাজ আমরা সম্পন্ন করেছি।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, ছোট পরিসরে আবার সংলাপ হতে পারে। তবে বিএনপি রাজি কি না—জানতে চাইলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের ডাকেন তাহলে হয়তো যাওয়া যাবে। কিন্তু আমরা নিজেদের থেকে যেচে যাব বলে মনে হয় না এখন পর্যন্ত। তারপর জোটের পরবর্তী বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.