শুক্রবার ৬ আশ্বিন, ১৪২৫ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

‘মনে চায় শালারে একটা দেই’

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: ইস! কানের পর্দাটা মনে হয় ফাইটা গেলো। এতো জোরে হর্ন বাজায়। মনে চায় গিয়ে শালারে একটা দেই। ওই ম্যায়া এইহানে এতো জোরে বাজানোর কি হল? এভাবেই একজন সিএনজি যাত্রী প্রতিক্রিয়া দেখালেন। ঘড়ির কাটা শুক্রবার বিকাল সোয়া ৫টা। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডের সাইনবোর্ড থেকে চাষাড়ায় সিএনজি যোগে ফিরছিলেন ক্ষদ্র ব্যবসায়ী আকবর হোসেন। সিএনজিতে এই প্রতিবেদকও ছিল। আকবর হোসেন থাকেন শহরের মাসদাইর। তার সাথে ৭-৮ বছরের ছেলে আরমান। জালকুড়ি বাসস্ট্যান্ডের সামনে সিএনজিটি হালকা জ্যামে পড়ে। এসময় পিছনে একটি ট্রাক হর্ন বাজায়। হর্নের বিকট শব্দে অনেকটা আঁতকে উঠে আকবরের ছেলে। তিনিও বলে উঠেন কানের পর্দাটা মনে হয় ফাইটা গেলো। দাঁত কিটমিটিয়ে চেঁচিয়ে উঠেন তিনি। সিএনজি থেকে মাথা বের করে ট্রাক চালককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ওই ম্যায়া এতো জোরে হর্ন বাজায়। আর দেখেন না সামনে জাম। এইহানে বাজানোর কি হল? নিরুত্তর ট্রাক চালক। গ্লাসের ভেতর থেকে শুধু তাকিয়ে আছেন। সিএনজি যাত্রী কি বলছেন তার কোন কর্ণপাত নেই। এসময় বিড় বিড়িয়ে আকবর বলেন মনে চায় গিয়ে শালারে একটা দেই। কিছুপর পর এই প্রতিবেদক তার সঙ্গে পরিচিত হন। আকবর বলেন, কন তো ভাই, এইভাবে হরন (হর্ন) বাজাইলে কান ঠিক থাকে। পুলিশ হেগো কিছু কয় না কেন? চাষাড়া রাইফেলস ক্লাবের সামনে আসার পর সিএনজি থেকে যে যার মতো গন্তব্যে।

কিন্তু আকবর হোসেনের মতো নারায়ণগঞ্জের এমন হাজারো মানুষ বিরক্তিকর যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্নের শব্দের শিকার হচ্ছেন। এই হর্নের শব্দ অতিরিক্ত মাত্রায় শব্দ সৃষ্টি করে। সাধারণ শব্দের চেয়ে হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ কয়েকগুন বেশি। এই শব্দ মানুষের দেহে ও মস্তিকে মারাত্বক ক্ষতি সাধন করে। যদিও ২০১৭ সালে পরিবেশ দূষণকারী হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ ও বাজারে থাকা হাইড্রোলিক হর্ন ৭ দিনের মধ্যে জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। এবং ২০১৭ সালের ২৭ আগস্টের পর যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা হলে জব্দ করতে হবে গাড়ি। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় এ রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এমন নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। উচ্চ আদালতের এ আদেশকে স্বাগত জানিয়েছিলেন পরিবেশবিদ ও সাধারণ মানুষ। কিন্ত কে শোনে কার কথা।

উচ্চ আদালতের এই নির্দেশের পরেও দেখা যায় নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন জায়গায় যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার হচ্ছে। বন্ধ হয়নি হাইড্রেলিক হর্নের ব্যবহার।

শুক্রবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নগরের কয়েকটি সড়কে সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ বাসে উচ্চমাত্রার হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার করে চলছে। বিশেষ করে ট্রাকসহ ছোট পিকআপগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোলিক হর্ন। এছাড়া ইজিবাইক ও মোটর বাইকেও মনগড়া হর্ন ব্যবহার করে। যার শব্দ প্রচন্ড বিরক্তিকর। নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রবিন্দু চাষাড়া চত্বরেও দেখা যায় গাড়ির ড্রাইভাররা বিনা কারণে অহেতুক হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার করছে। দেখছে জ্যাম, তারপরও হর্ন বাজাচ্ছে। কিন্তু এই হর্নের কারণে নগরবাসীর সমস্যা হলেও হাইড্রোলিক হর্নের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোন ব্যবস্থা।

ট্রাক ড্রাইভার ইলিয়াস আলীর নিকট তার গাড়ির হাইড্রোলিক হর্নের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই হর্নের দাম কম, এই জন্য লাগাইছি। শব্দ বেশি, গাড়ি তাড়াতাড়ি সরে। এইটা মানুষের কানে গিয়া তাড়াতাড়ি লাগে। তবে এই হর্নের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তার জানা আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেনি। বলেন, না ওই একটু বেশি শব্দ হয়, আর কোন সমস্যা নাই।
মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী আখিঁ বলেন, যেদিন রাস্তায় জ্যামের মাঝে এই সব আওয়াজগুলো যখন শুনি তখন মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। বাসায় গিয়ে সাথে সাথে মাথা ব্যাথার ঔষধ খাওয়া লাগে।

বন্ধরের বাসিন্দা ফার্মেসী ডা. রাকিবুল ইসলাম বলেন, শব্দগুলো স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। স্কুল, কলেজের সামনেও অতিরিক্ত শব্দ করে যাওয়া যায়। এসবের ছেলে-মেয়েদের পড়া-লেখার মোনযোগ নষ্ট হয়।

ব্যাংকের কর্মচারী মনিরুজ্জামান বলেন, হঠাৎ করে বিকট আওয়াজ মানুষের মনোযোগ নষ্ট করে। এর ফলে যেকোন সময় রাস্তায় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমার আম্মা হার্টের রোগী। ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসছিলাম দুইমাস আগে। লিংক রোডের তখন কাজ চলছিল। জ্যামে বইসা ছিলাম। তার উপর তার হর্নের আওয়াজ। আম্মায় বাসায় যাওয়ার পর আরও অসুস্থ হইয়া গেছে।
বিশেজ্ঞদের মতে, সাধারনত মানুষ ৪০-৪৫ ডেসিবল মাত্রার শব্দ ভালো শুনতে পায় কিন্তু হাইড্রোলিক হর্নে ১০০ ডেসিবলেরও বেশি মাত্রার শব্দ সৃষ্টি করে থাকে। এরকারনে, কানে সমস্যা হবার সম্ভাবনা রয়েছে, রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃৎপিন্ড ও মস্তিষ্কে অক্সিজেনের স্বল্পতা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। এছাড়া বমি হওয়া, শ্বাসকষ্ট, মাথাঘোরা, দিক ভুলে যাওয়া, মানসিক ক্ষতি সহ নানান ধরনের সমস্যা হতে পারে।
হাইড্রোলিক হর্ন সম্পর্কে জেলা পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) আব্দুর রশিদ বলেন, হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো পুরোপুরি নিষেধ। তবে এই হর্ন বাজানোর ক্ষেত্রে জরিমানা মাত্র ১০০ টাকা। তাই জরিমানা নিলেও ড্রাইভারদের মধ্যে কোন ভয় নেই। তবে ট্রাফিক পুলিশের জনবল এতো কম যে, সব সময় সকল বিষয়ে নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। শব্দ মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ন। কারণ শব্দ বা আওয়াজ না করতে পারলে হাজারো মানুষ একে ওপরের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সেই শব্দ যখন অতিরিক্ত মাত্রায় হয়ে যায় তখন সেটা পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। মানুষে জন্যও ক্ষতিকর।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: অপরাধ ও দুর্নীতি,নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.