মঙ্গলবার ২৯ কার্তিক, ১৪২৫ ১৩ নভেম্বর, ২০১৮ মঙ্গলবার

শ্রমিক বান্ধব নেতার মধ্যস্থতায় ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাওনা বুঝে পাবেন এক্সেটেক্সের শ্রমিকরা

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: নারায়ণগঞ্জে কোথাও কোন নীট গার্মেন্টে শ্রমিক অসন্তোষ বা কোন বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তড়িৎ গতিতে সেখানে ছুটে গিয়ে নীট গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ এর সভাপতি সেলিম ওসমান সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকেন। মূলক তিনি মালিক সংগঠনের নেতা হলেও বরাবরই শ্রমিকদের আইন মোতাবেক মালিক পক্ষের কাছ থেকে ন্যায্য পাওনার পাইয়ে দেওয়ার নজির রয়েছে অনেক। এক্সোটেক্স গার্মেন্টের ঘটনায় রোববার সকালে ব্যবসায়ী নেতা হয়েও শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং এর সভাপতি সেলিম ওসমান সত্যিকার অর্থে শ্রমিক বান্ধব সেটা আবারো প্রমান করেছেন।

এ ঘটনায় আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শ্রম আইন অনুযায়ী সমস্ত শ্রমিকের ন্যায্য পাওয়া পরিশোধ করতে মালিক পক্ষকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তাদের ভুল সিদ্ধান্তে উদ্ভট পরিস্থিতির প্রায় ১ হাজার শ্রমিক পরিবারের যাতে কোন দুর্ভোগ পোহাতে না হয় তার জন্য মানবিক দিক বিবেচনায় আগস্ট মাসের বকেয়া বেতনের সাথে প্রয়োজনে সেপ্টেম্বর মাসের পুরো বেতন পরিশোধ করতে মালিক পক্ষকে অনুরোধ করেছেন তিনি। এদিকে নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের বিষয়টি বুঝতে পেরে মালিক এক বাক্যেই নিদিষ্ট সময়ের পূর্বেই শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করে দিবেন বলে সকলের উপস্থিতিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এর আগে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রুট সংলগ্ন সুগন্ধা এলাকায় অবস্থিত এক্সোটেক্স গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের না জানিয়ে কারখানাটি স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে মালামাল সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার খবরে শনিবার গভীর রাত থেকেই কারখানাটি ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখায় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। এ ঘটনার খবর পেয়ে বিকেএমইএ এর সভাপতি সেলিম ওসমান, শিল্প পুলিশ ও বিকেএমইএ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মালিক ও শ্রমিক পক্ষে সাথে কথা বলে পরিস্থিত শান্ত রাখতে বলেন এবং সকালে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে সমস্যা সমাধান দিবেন বলে শ্রমিক নেতৃবৃন্দদের আশ্বস্ত করেন।

পরে রোববার ২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের সাথে কথা বলেন বিকেএমইএ সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। এ সময় মালিক পক্ষ কারখানাটি স্থানান্তরের ব্যাপারে শনিবার রাতে নোটিশ প্রদানের কথা স্বীকার করেছেন এবং সেটি তাদের ভুল হয়েছে বলেও মেনে নেন। তবে তাদের প্রতিষ্ঠানের আইনজীবী পরামর্শকের ভুল পরামর্শের কারনে এ উদ্ভট পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে তাঁরা বিকেএমইএ সভাপতিকে অবহিত করেন।

পরে সেলিম ওসমান শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে নিজেকে লজ্জিত ও দু:খিত প্রকাশ করে বলেন, কারখানাটি স্থানান্তর করা হচ্ছে। কোন শ্রমিককে ছাটাই করা হচ্ছে না। আইনে আছে যদি কোন কারখানা স্থানান্তর করা হয় এবং তার দুরত্ব যদি ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে তাহলে কোন ছাটাই না করে পুরনো সকল শ্রমিককে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে কৃর্তপক্ষ শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য যথাযথ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারেন। তারপরেও যদি কোন শ্রমিক সেখানে কাজে যোগ দিতে রাজি না থাকে তাহলে তাদেরকে আইন মোতাবেক শ্রমিক সেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে পারে। এক্ষেত্রে অব্যাহতি নেওয়া শ্রমিকদের আইন মোতাবেক তাদের ন্যায্য পাওনা অবশ্যই মালিক পক্ষকে বুঝিয়ে দিতে হবে। কিন্তু দুরত্ব ১০ কিলোমিটারের কম হলে এক্ষেত্রে মালিক শুধু শ্রমিকদের নিযোগ নিশ্চিত করবে। তবে আপনাদের নতুন কারখানাটির দুরত্ব এখান থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটারের মধ্যে । আপনারা সবাই নতুন কারখানায় কাজে যোগ দিবেন আপনাদের একজন শ্রমিককেও ছাটাই করা হবে না। আপনারা কি তাতে রাজি আছেন?

এ সময় উপস্থিত সকল শ্রমিক নতুন কারখানায় যোগ না দেওয়ার কথা জানালে বিকেএমইএ সেলিম ওসমান আগামী ৭ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে আইন মোতাবেক সকল শ্রমিকের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের কারনে সৃষ্ট উদ্ভট পরিস্থিতির কারনে শ্রমিকদের যাতে কোন দুর্ভোগ পোহাতে না হয় সেজন্য মানবিক বিবেচনায় বকেয়া বেতনের সাথে সেপ্টেম্বর মাসের বেতন পরিশোধ করতে মালিক পক্ষের কাছে অনুরোধ রাখেন তিনি।

এর কারন ব্যাখা দিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের নতুন করে চাকরি পেতে একমাস সময় চলে যাবে। আর এই এক মাস যাতে শ্রমিকদের জীবন যাপনে কোন প্রকার কষ্ট না হয় সে বিষয়টি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তোমরা ঈদ উদযাপন শেষে মাত্র কাজে যোগ দিয়েছো। মালিক পক্ষের একটি ভুলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে তোমাদের আমি আশ্বস্ত করছি তোমরা তোমাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাবে। যদি মালিক পক্ষ তোমাদের পাওনা বুঝিয়ে না দেয় প্রয়োজনে আমি নিজে তোমাদের পাওনা পরিশোধ করবো। তবে তোমাদের কাছে অনুরোধ হাতে বেশ কিছু টাকা পাবে এই ভেবে তোমরা বসে থাকবে না। তোমরা অন্যত্র চাকরিতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করো। তোমরা পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য হিসেব নিকেশ করতে হবে। এর জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন তোমরা আমাকে সেই সময় টুকু দাও।

শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে সেলিম ওসমান তাৎক্ষনিক ভাবে ৩৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। যেখানে ১০জন নারী শ্রমিক, ১০জন পুরুষ শ্রমিক, মালিক পক্ষের ৫জন, বিকেএমইএ পক্ষ থেকে ৫ জন এবং বিভিন্ন সংগঠনের ৫জন শ্রমিক নেতার উপস্থিতিতে শ্রমিকদের পাওনাধির ব্যাপার হিসাব করা হবে। এমপি সেলিম ওসমানের এমন সিদ্ধান্ত মালিক পক্ষ ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ সহ সাধারণ শ্রমিকেরা হাসি মুখে গ্রহণ করেন। পরে তাঁর অনুরোধ শ্রমিকেরা সুশৃঙ্খল ভাবে উক্ত এলাকা ত্যাগ করে নিজ নিজ স্থানে চলে যায়। তাৎক্ষনিক

এ ব্যাপারে বিকেএমএই সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান জানান, কোন কারখানা স্থানান্তর করতে হলে এক মাস আগে থেকেই নোটিশ প্রদান করতে হয় অথবা শ্রমিকদের সাথে সরাসরি আলোচনা করতে হয়। কিন্তু তাঁরা সেটা করেনি। এক্ষেত্রে মালিকপক্ষ মৌখিক ভাবে আমাকে অবহিত করেছেন তাদের আইনজীবীর ভুল পরামর্শে এমনটা হয়েছে এবং মালিক পক্ষ তাদের ভুল বুঝতে পেরে বিকেএমএই এর দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের সকল পাওনা পরিশোধ করতে রাজি হয়েছে। এ জন্য আমি বিকেএমএই এর পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক পক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সাথে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটিয়ে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ন অবস্থানের কারনে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ এবং শিল্প পুলিশ ও ফতুল্লা থানা পুলিশকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সম্প্রতি সময়ে বেশ কয়েকটি কারখানায় এমন ঘটনা ঘটার পূর্বেই গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। ফলে নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক অসন্তোষের মত ঘটনা ঘটেনি। এ জন্য জেলা প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি গার্মেন্ট গুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে গোয়েন্দা তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করার জন্য জেলা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ রাখছি।

তিনি আরো বলেন, বিগত কয়েকটি ঘটনায় আমার মনে হয়েছে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং শ্রমিকেরাও সঠিক শ্রম আইন সম্পর্কে অবহিত নয়। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় তাই চলতি মাসের যে কোন সময় শ্রম আইন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য মালিক এবং শ্রমিক সহ নীট সেক্টরের সাথে জড়িত সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে বিকেএমইএ এর পক্ষ থেকে একটি গোল টেবিল আলোচনার আয়োজন করা হবে।

প্রসঙ্গত, পবিত্র ঈদ উল আযহার পূর্বে নারায়ণগঞ্জ বিসিকে প্যানটেক্স গার্মেন্টে সৃষ্টি শ্রমিক অসন্তোষ এমপি সেলিম ওসমান সরেজিমনে উপস্থিত হয়ে উভয় পক্ষের কথা শুনে শ্রমিকদের দাবী মোতাবেক ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে শ্রমিক অসন্তোষের অবসান ঘটান। পাশাপাশি ঈদের পূর্বে এবং পরে আরো বেশি কয়েকটি গার্মেন্টে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান দিয়েছেন তিনি। যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই শ্রমিকের পক্ষে গিয়েছে বলে মনে করেন শ্রমিক নেতৃবৃন্দরা। সেই তার সিদ্ধান্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন মালিক পক্ষও।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.