রবিবার ৮ আশ্বিন, ১৪২৫ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রবিবার

হায়! একটি টাকাও জোটেনি সম্রাট আকবের কপালে

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: সহানুভ‚তি ও আশ্বাস মিললেও কোন আর্থিক সহযোগিতা পাননি সেই ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলায় আহত সম্রাট আকবর সবুজের জীবনে। শরীরে হাড়ের ভিতর ২ টি স্পিন্টার নিয়ে স্ক্রাচে ভর দিয়ে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে বিত্তবান মানুষের দ্বারে দ্বারে। তার একটাই আকুতি, ‘দুইটা বিবাহযোগ্য বোনকে আমি ক্যামনে বিয়া দিমু। বিয়ার খরচ কই পামু।’ কেরানীগঞ্জের চর রুহিতপুরে একটি ভাড়া বাসায় স¤্রাট আকবর তার দুই বোনকে নিয়ে বসবাস করছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তার মা মাহমুদা মনোয়ারা বেগমও আহত হয়েছিলেন। মনোয়ারা বেগম আর্থিক সহায়তা পেলেও সবুজের কপালে কিছুই জোটেনি।  গতকাল সবুজের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার মা ছোট বেলায় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে কাজ করতেন। মায়ের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর অনেক গুনের কথা শুনেছি। মায়ের কাছ থেকে এসব শুনেই ছোট বেলা থেকেই আওয়ামী লীগের যে কোন মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিতেন।’

তিনি বলেন, ঘটনার দিন কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে তার মার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আসেন। সমাবেশ চলাকালে তিনি মায়ের সঙ্গে ট্রাকের (সমাবেশ মঞ্চ) সামনে বসেছিলেন। গ্রেনেড বিস্ফোরণের সময় মনে হলো চারদিক কেঁপে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী (তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা) শেখ হাসিনার চোখ থেকে চশমা ছিটকে পড়ে। তিনি সেই চশমা হাত দিয়ে তুলতেই আরো একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটে। তার শরীরের ওপর দিয়ে অনেক মানুষ পদদলিত করে চলে যায়। এ ঘটনার পর তিনি দেখতে পান তার মা রক্তাক্ত অবস্থায় পাশেই পড়ে আছে। ’

চিকিৎসার বর্ণনা দিয়ে সবুজ বলেন, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসার পর তিনি বাসায় ফিরে যান। কিন্তু শরীরের ভিতরে একাধিক স্পিøন্টারের ব্যাথায় তিনি কাতর হয়ে পড়েন। এক সময় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ফল বিক্রি করে সংসার চালাতেন। পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর তার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে তাদের কেরাণীগঞ্জের ১০ শতাংশ জমি মাত্র সাড়ে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন। এই টাকা ভেঙ্গে ভেঙ্গে নিয়ে সংসার চালাতেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্রেনেড হামলায় নিহত ও আহতদের পরিবারে আর্থিক সাহায্য করা হয়। কিন্তু তার কপালে এখন পর্যন্ত একটি টাকাও জোটেনি। অনেক কষ্ট করে একবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি দেখা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে একটি চাকরি দেয়ার আশ্বাস দেন। চাকরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেই সুপারিশ নিয়ে অনেক মন্ত্রনালয়ে একটি পিয়ন পদের চাকরির জন্য ঘুরেছি। কিন্তু ক্র্যাচে ভরদিয়ে চলাফেরা করি দেখে কেউ তাকে চাকরি দেন না। তিনি আকুতি জানান, ‘প্রতিবন্ধী কোটায় হলেও আমাকে একটি চাকরি দিন। আমার বিবাহযোগ্য দুই দুইটা বোনের মুখের দিকে চেয়ে।’

শুধু সম্রাট আকবর সবুজই নন; দীর্ঘ ১৪ বছর পরে আজও আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে তাড়া করে ফেরে একুশে আগস্টের মৃত্যুদূত। নৃশংস সেই গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে পঙ্গুত্বের বোঝা নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা লিটন মোল্লা, নাসিমা ফেরদৌস,সাবিহা, রুমা, দীপ্তি, নাজিম, ফাহমিদা, সাজেদুল, দৌলতুন্নাহারসহ শত শত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। কেউ চলৎশক্তিহীন। কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। অনেকের শরীরে রয়ে গেছে অসংখ্য স্পিন্টারের অস্তিত্ব। সব মিলিয়ে অসহ্য যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন এ মানুষগুলো। এদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের বর্তমান এই দুঃসহ জীবনের কথা। স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা লিটন মোল্লার শরীরে এখন ৫০ টি স্পিন্টার। দুই কানে সমস্যা। দেশে চিকিৎসা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। অর্থ সংকটে তা হচ্ছে না। সবুজবাগ থানা মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ফাহমিদা খানম মনির সারাদেহে এখনো শত শত স্পিন্টার। গ্রেনেডের আঘাতে কোমরের অনেকখানি মাংস উড়ে গিয়েছিল। স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা সম্পাদিকা এডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজলের শরীরে এখনো সোয়া তিনশ স্পিন্টার রয়েছে। পল­বী থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভানেত্রী দৌলতুন নাহারের পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাওয়াসহ দুই পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। মুমূর্ষু অবস্থায় কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে নেয়ার পর বেশ কয়েক দফা অপারেশন হয় তার। ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বাম চোখেও ঝাপসা দেখেন। স্পিন্টারের আঘাতে দুই পাসহ শরীরের পুরো নিম্নাংশ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা নীলা চৌধুরীর। বাঁ পা আকারে কিছুটা ছোট হয়ে গেছে তার। শরীরে অসংখ্য স্পিন্টার রয়ে গেছে এখনো। বর্তমানে সুইডেনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা সম্পাদিকা মাহবুবা পারভীন শরীরে অসহ্য জ্বালা-যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন। মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভার বিভাগদী গ্রামের মোহাম্মদ আলী হাওলাদারের ছেলে হান্নান হাওলাদারের একটি পা গ্রেনেড হামলায় নষ্ট হয়ে গেছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর নেতা মিজি মনির হোসেনের দুই পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। এখন স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হয় তাকে। কোতোয়ালি থানার নেতা বাহার মিয়ার শরীরের বাঁ অংশ অবশ। স্ক্র্যাচে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন তিনি।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.