রবিবার ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ রবিবার

না.গঞ্জের যেই পাহাড়ে শান্তি স্থায়ী হয় না

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: পাহাড় শুনে হয়তো একটু আতকে উঠেছেন। নারায়ণগঞ্জে আবার পাহাড় আসলো কোথা থেকে! আসলে এই পাহাড় সেই পাহাড় নয়। জায়গার নাম কালাপাহাড়িয়া। নাম শুনে মনে হয় সেখানে অনেক ছোট-বড় পাহাড় আছে! বিষয়টা তেমন নয়। আছে মেঘনায় জেগে উঠা কয়েকটি চর। এই চরগুলো ঘিরেই আড়াইহাজার উপজেলার সবচেয়ে দুর্গম ইউনিয়ন কালাপাহাড়িয়া। মূলত কয়েকটি চর নিয়ে গঠিত এই ইউনিয়নে চৌদ্দটি গ্রাম। ৯ দশমিক ১৫ বর্গ কিলোমিটারের এই জনপদে প্রায় ৪০ হাজার লোকের বসবাস। গ্রামবাসীর প্রধান পেশা মাছ ধরা। তবে কৃষি খামারও আছে। শিক্ষা, সংষ্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান, খেলা-ধুলা সবই হয়। সরকারী-বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, কিন্ডার গার্টেন, মসজিদ-মন্দির, খেলার মাঠ, সরকারী-বেসরকারী অফিস মিলিয়ে একটি আদর্শ ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে কালাপাহাড়িয়া। ২০০১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী শিক্ষার হার ৭০ ভাগ। সরকারী ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১টি। আছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

ইউনিয়নে ৫টি হাটবাজার রয়েছে। যেগুলোতে গ্রামবাসী দৈনিক ও সপ্তাহিক ক্রয়-বিক্রয় করে। এগুলো হলো রাধানগর বাজার, পূবকান্দী সাহেব বাজার, ইজারকান্দি বাজার, মধ্যার চর মুনছুর হাজীর বাজার ও কালাপাহাড়িয়া নয়া বাজার। ইউনিয়নে ভেতর দুটি খাল প্রবাহিত। একটি পূবকান্দি গদার খাল ও অপরটি খালিয়ার চর সাইকার খাল।
ইউনিয়নের পশ্চিম দিকে দাঁড়ালে দেখা যায় বিশাল মেঘনা নদী। নদীর ওপার আড়াইহাজার উপজেলার খাগকান্দা ইউনিয়ন। পূর্বদিকে বিশাল মেঘনা নদী পেরিয়ে কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলা। দক্ষিনে মেঘনা নদীর ওপারে কুুমিল্লার মেঘনা উপজেলা। উত্তরে মেঘনা নদীর ওপারে ব্রাক্ষনবাড়ীয়া জেলার বাঞ্চারামপুর ঊপজেলা। এছাড়া নদীর মাঝখানে বড় বড় চর রয়েছে। যেখানে দাঁড়ালে মনে হয় সমুদ্র সৈকতেই আছি।
এতো সুন্দর নদী বেস্টি একটি ইউনিয়ন। অথচ এই ইউনিয়নে শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। এতে হতাহতের সংখ্যা বাড়ে। রাজনৈতিক প্রভাব, আধিপত্য ও অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রায়ই একাধিক পক্ষ দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রায়ই ঘটে সহিংস কর্মকান্ড আর হত্যাকান্ড। একের পর এক হত্যাকান্ডে কালাপাহাড়িয়া পরিণত হয়েছে এক আতঙ্কজনক জনপদে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, দিনেও এখানে পুলিশ যেতে ভয় পায়।

কালাপাহাড়িয়ার ইতিহাস
কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের সঠিক কোন ইতিহাস এর প্রমান আজও পাওয়া যায়নি। তবে এটুকু জানা যায়, এটি একটি দ্বীপ। এর চারদিক দিয়ে বিরাট আকারের মেঘনা নদী দিয়ে ঘেরাও করা। অত্র ইউনিয়নটির উত্তরদিক দিয়ে নদী পার হলেই ব্রাক্ষনবাড়ীয়া জেলায় পা রাখা যায়। পশ্চিম দিক দিয়ে নদী পার হলেই নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলায় পা রাখা যায়। দক্ষিন দিক দিয়ে নদী পার হলেই কুমিল্লা জেলার মেঘনা উপজেলায় পা রাখা যায়। পূর্ব দিকে নদী পার হলেই কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলায় পা রাখা যায়। পূর্ব পূরুষ হতে যা জানা গেছে, প্রায় ২০০ বছর পূর্বে বিশাল মেঘনার বুকে এই চরটি জেগেছিল। বিভিন্ন জেলা হতে লোকজন এসে বসতি স্থাপনা শুরু করে। মোট জনসংখ্যা সর্বশেষ আদমশুমারী অনুযায়ী প্রায় ৪০ হাজার।

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব
ইউনিয়নের প্রখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রয়াত আব্দুর রশিদ সরকারী চাকরী জীবি ছিলেন। তিনি সমাজ সেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন। প্রয়্যাত এরশাদুল্লাহ। ব্যাংক অফিসার ছিলেন, ডঃ সিরাজুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের মূত্তিকা ও বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।

অশান্তের নেপথ্যে
সর্বশেষ মধ্যারচর গ্রামে মেঘনা নদীতে চিংড়ি মাছ ধরার ফাঁদ পাতা নিয়ে আওয়ামী লীগের দু`পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে সুজন মিয়া ও রোজিনা আক্তার নামে দু`জন খুন হন। আহত হন অন্তত আরও ১০ জন। এরআগে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ঈদের ছুটিতে আসা কাউন্টার টেররিজম বিভাগের পুলিশ কনস্টেবল রুবেল মাহমুদ সুমনকে ক্ষমতাসীনদের একটি পক্ষ দিনদুপুরে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের জেরে ক্ষমতাসীনদের আরেক পক্ষ নিরীহ গ্রামবাসীর ৩০-৩৫টি বসতবাড়িতে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও তাদের অপতৎপরতায় অসহায় হয়ে পড়েছিল।
গত কয়েক বছরে ওই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জেরে খুন হয়েছেন- সৌদিপ্রবাসী রাসেল মিয়া, পূর্বকান্দির আবদুর রব, মাদ্রাসাছাত্রী শারমিন আক্তার, হাজিরটেকের জয়নাল আবেদীন, কদমীচরের আবদুস সালাম, আমান, লাল মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল রুবেল মাহমুদ সুমন এবং সর্বশেষ সুজন মিয়া ও রোজিনা আক্তার। ২০১১ সালে ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম স্বপন ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফাইজুল হক ডালিম গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মেঘনা নদীতে ডুবে মারা যান খাগকান্দা নৌফাঁড়ির এসআই নাসির সিরাজী। এ ছাড়াও গুম হয়েছেন খালিয়ারচরের শরীফুল ইসলাম শরীফ আর পঙ্গু হয়েছেন হাজিরটেকের সাইদুল ইসলাম, কালাপাহাড়িয়ার আবদুল বারেকসহ অনেকে।
স্থানীয়রা জানান, সহিংসতার সময় এখানে ব্যবহার করা হয় টেঁটা, বল্লম, ছুরি, রামদাসহ বিভিন্ন দেশি অস্ত্র, বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেলসহ কয়েক প্রকার বিস্ম্ফোরক দ্রব্য। পুলিশ তৎপরতার অভাবে বর্তমানে এ এলাকায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের সমারোহ ঘটেছে। সন্ধ্যা হলেই অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় সশস্ত্র গ্রুপগুলো।
এ ব্যাপারে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল আউয়াল বলেন, প্রশাসনের তৎপরতার অভাব, দেশি ও আগ্নেয়াস্ত্রের সহজপ্রাপ্তি ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার না করায় দিন দিন সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নিয়মিত অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হলে ইউনিয়নে আবার শান্তি ফিরে আসবে বলে তিনি আশা করেন।
আড়াইহাজার থানার ওসি মুহাম্মদ আবদুল হক জানান, ইউনিয়নটি চারদিকে পানিবেষ্টিত। তাই স্পিডবোট বা নৌকা ছাড়া কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকায় যাওয়া কঠিন। এ সুযোগ নেয় বেশ কয়েকটি পক্ষ। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে ধারালো অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে ওই এলাকা পুলিশের শতভাগ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কোনো সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া গেলে অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.