মঙ্গলবার ২৯ কার্তিক, ১৪২৫ ১৩ নভেম্বর, ২০১৮ মঙ্গলবার

ক্ষোভে উত্তাল রাজপথ

  • জাবালে নূরের তিন চালকসহ ৫ জন গ্রেফতার
    শিক্ষার্থীদের স্বত:স্ফ‚র্ত সড়ক অবরোধ
    বাস চালকের ফাঁসি দাবি

বিশেরবাশী ডেস্ক: কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের জেরে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও যানবাহন ভাংচুর করেছে। ঘটনার পর নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের মন্তব্যে রবিবার বিকাল থেকে উত্তেজিত শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা। আর সেই উত্তাপে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৮ ছাত্রের মৃত্যুর গুজব ছড়ালে গতকাল সকালে নতুন ভাবে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। সকালে শিক্ষার্থীরা শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুলের সামনে জড়ো হয়। তারা সেখানে বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিল নিয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে এমইএস বাস স্টপেজে অবরোধ করে। শিক্ষার্থীরা ‘নৌমন্ত্রী নৌমন্ত্রী ক্ষমা চাও ক্ষমা চাও, ডব ধিহঃ ঔঁংঃরপব, ঘাতক চালকের ফাঁসি চাই, জাবালে নূর গাড়ি বন্ধ করো ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে ওই এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। এক পর্যায়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সড়কে যানবাহন ভাংচুর করে। তাদের সঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার আরো চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে যোগ দেয়।

সকালে শিক্ষার্থীদের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজে শিক্ষকদের বৈঠক হয়। বৈঠকে শিক্ষার্থীরা নৌ মন্ত্রীর পদত্যাগ, ঘাতক চালকের ফাসি কার্যকর, রমিজ উদ্দিন কলেজের ছাত্রদের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মান, নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা চালুসহ ১০ দফা দাবি পেশ করে। পরে শিক্ষকরা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে এসে সড়ক অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায় শিক্ষার্থীদের কাছে। শিক্ষার্থীরা অনুরোধ প্রত্যাখান করে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। এ ঘটনার পর দুপুরে শাহবাগ ও কলাবাগান এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এই এলাকায় বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করা হয়। দুপুরের সরকারী বাঙলা কলেজের সামনে শিক্ষার্থীরা জাবালে নূর পরিবহনের ১৫ টি বাস ভাংচুর করে। বিকালে র‌্যাব সদর দফতর থেকে জানানো হয় যে ওই দুর্ঘটনায় জড়িত তিনটি বাসের চালক ও হেলপারসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। পরে বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে রায়ট কার, জলকামান নিয়ে পুলিশ এমইএস বাস স্টপেজে সড়ক অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য অভিযান চালায়। পুলিশের ধাওয়ার মুখে শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে এক পাশে সরে যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দূর্ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতি, ওই রুটে জাবালে নূর পরিবহনের বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদের সাথে বেপরোয়া আচরন, কলেজের সামনে দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া, ছাত্রদের গাড়িতে উঠাতে বাস চালকদের অনীহা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, কলেজের সামনে রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটওভার ব্রিজের দাবি আলোচনা চলতে থাকে। তারা রাতেই নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয় পরদিন এসব বিষয় নিয়ে রাস্তায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে। পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ি গতকাল সকাল ৭ টায় কলেজে ছাত্রছাত্রীরা আসা শুরু করলে সকাল ৯ টার দিকে ছাত্ররা রাস্তায় নামার চেষ্টা করে। কিন্তু কলেজের শিক্ষকর ছাত্রদের কলেজের মধ্যে ঢুকিয়ে ক্লাস কক্ষে আটকে রেখে রাস্তায় কর্মসূচী পালন থেকে বিরত রাখতে চায়। এরপর পুলিশ কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে ধরে এনে উত্তরামুখী বিভিন্ন গাড়িতে জোর করে তুলে দেয়। পুলিশ ও কলেজের শিক্ষকদের বাধার মুখে ছাত্রদের কর্মসূচী পালনে বাধার খবরে ৮ ছাত্রের মৃত্যুর গুজব আরো জোরালো হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আন্দোলনের সমর্থনে একজন সাবেক ছাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্যের পরই আশেপাশের ডজনখানেক ছাত্রদের মাঝে ওই বক্তব্যের খবর পৌছে গেলে ক্লাস বন্ধ রেখে ছাত্ররা রমিজউদ্দিন কলেজের সামনে জড়ো হতে থাকে। মুহুর্তে কয়েক হাজার ছাত্র একত্রিত হয়ে যায় কলেজের সামনে। তারা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে দুপাশের সড়ক অবরোধ করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনের বাইরে যায়। পুলিশ প্রথমে ছাত্রদের ঠেকানোর চেষ্টা করলেও পরে পুলিশ নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বাধ্য হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকাংশ স্কুল এবং কলেজের ছাত্র হওয়ায় পুলিশ জল কামান ও এপিসিও ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়। পরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আশেপাশের কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। এগুলো হলো ভাষানটেক সরকারি কলেজ, গুলশান কমার্স কলেজ, গুলশার ডিগ্রী কলেজ, উত্তরা মাইলস্টোন কলেজ, কুর্মিটোলা বিএফ শাহীন কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ, বনানী বিদ্যা নিকেতন কলেজ।

সকালে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, নৌমন্ত্রী ক্ষমা চাইলেই অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এসময় শিক্ষার্থীরা ঘাতক বাস চালককে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে। দুপুরে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ নুরুন্নাহার ইয়াসমিন। নুরুন্নাহার ইয়াসমিন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমাদের প্রতিবাদ আর দাবি সরকার শুনেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে কতৃপক্ষ সকল দাবি দাওয়া মেনে নেবে। জাবালে নুর পরিবহনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তার অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

জাবালে নূরের তিন চালকসহ গ্রেফতার ৫ : ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি কাজী শাহান হক বলেন, দুর্ঘটনার ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।  দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় পাঁজ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এদের মধ্যে তিন চালক ও দুই জন হেলপার রয়েছেন। ঘাতক বাসের চালকের নাম মাসুম বিল্লাহ। র‌্যাবের কাছে ঘটনার নির্মম বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। গতকাল ভোররাতে মাসুম বিল্লাহকে বরগুনা থেকে এবং বাকী চারজনকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১ এর একাধিক দল। গ্রেপ্তারকৃতদের বরাদ দিয়ে র‌্যাবের মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, তিনটি বাসই জাবালে নূর পরিবহনের। প্রথমে একটি বাস কুর্মিটোলা বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ায়। তখন ওই বাসটিতে উঠতে যাচ্ছিলেন শিক্ষার্থীসহ অন্য যাত্রীরা। এমন সময় বেপরোয়া গতিতে পেছন থেকে একই পরিবহনের আরো দুটি বাস আসতে থাকে। বাস দুটির প্রতিযোগিতার কারণে একটি বাস জায়গা না পেয়ে ফুটপাতের ওপর উঠে পড়ে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দেয় বাসটি। বাস চালক মাসুম গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত লাশ দেখেন। পড়ে সেখান থেকে মাসুম বরগুনায় পালিয়ে যায়। র‌্যাব জানায়, শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া বাসটির নাম্বার ঢাকা মেট্রো ব-১১-৯২৯৭। চালক মো. মাসুম বিল্লাহকে (৩০) বরগুনার আমতলী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে হেলপার মো. এনায়েত (৩৮), জাবালে নূর পরিবহনের ঢাকা মেট্রো ব-১১-৭৬৫৭ নম্বর বাসের চালক মো. জুবায়ের (৩৬) ও ঢাকা মেট্রো ব-১১৭৫৮০ বাসের চালক মো. সোহাগ (৩৫) ও তার হেলপার রিপনকে (৩২) গ্রেপ্তার করা হয়।

অবরোধ শেষে বিকালে ভাংচুর, সংঘর্ষ : অবরোধের মধ্যে গতকাল দুপুর ২ টার পর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্তত ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠকে বসেন রমিজউদ্দিন কলেজের শিক্ষকরা এবং পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এর আগে কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধি কুলসুম মাইকে ঘোষনা দেন রমিজ উদ্দিন কলেজের ৪ জন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা ৮ জন সহ মোট ১২ জন থাকবেন এ বৈঠকে । বৈঠকে ছাত্রদের দাবীসহ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। এরপরই কলেজে বৈঠকে বসায় হয়। বৈঠকে ছাত্রদের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি পেশ করা হয়।  ওই কলেজের এক শিক্ষক বলেন, ছাত্রদের সমন্বয়ে গঠিত দলের সাথে কলেজের কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জামাল গনি খান বসেছেন। সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলো। ছাত্ররা ১০ টি দাবির কথা বলেছে। তাদের অধিকাংশ দাবির প্রতি কলেজের কমান্ডার একমত পোষণ করেছেন। সেখানে একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃস্টি হয়। পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রনে বাইরে যায়। কেউ কারো কথা শুনছিলে না। ওই শিক্ষক বলেন, এখানে বাইরের কিছু লোক এসে আমাদের কলেজের ছাত্রদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। ফেসবুকেও গুজব ছড়ানো হয়েছে। ঘটনায় মোট ২ জন মারা গেছে। ৯ জন আহত হয়েছে। আহত জুবাইদা, প্রিয়াঙ্কা, আলরাফি, মিমসহ ৯ জনের চিকিৎসা কলেজের অর্থায়নে চলছে সিএমএইচে। সবাই এখন আশঙ্কা মুক্ত। বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে পুলিশ, র‌্যাব এবং মিলিটারী পুলিশের যৌথ টিম ছাত্রদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজনা তৈরি হয়। সেখানে পুলিশকে লক্ষ্য করে ছাত্ররা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে এক পর্যায়ে কয়েক পুলিশ সদস্য আহত হয়। এরপরই পুলিশ একত্রিত হয়ে ছাত্রদের ধাওয়া করে। ছাত্ররা পুলিশের ধাওয়ায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটার সময় বেশ কিছু গাড়ি ভাংচুর করে। এক পর্যায়ে ছাত্রদের রাস্তা থেকে উঠিয়ে দেওয়ার পর দুপাশের যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

বিশেরবাশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.