বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

আনসার আল ইসলামের মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়া চট্টগ্রামে!

  • জুলহাজ-তনয় হত্যাকান্ডে জুবায়েরের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী

আনসার আল ইসলামের পলাতক পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ নেতা মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে তিনি আনসার আল ইসলামের পলাতক নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। আনসার আল ইসলামের পলাতক নেতা-কর্মীরা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘কুকি বিদ্রোহী’দের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ এলাকার জাকির হোসেন রোডের একটি বাড়ি থেকে জুবায়েরকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য পায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। গ্রেফতার হওয়ার ছয় মাস আগে চট্টগ্রামে মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হকের সঙ্গে জুবায়েরের দেখা হয়েছিল। জুবায়েরকে ঢাকার কলাবাগানে ইউএসএইডের সাবেক কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার সহযোগী মাহবুব তনয় হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার পর এসব তথ্য পাওয়া যায়। রিমান্ডে থাকার পর গত ২৩ জুলাই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আহসান হাবীবের কাছে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দীতে জুলহাজ-তনয় হত্যাকান্ডের কারণ, উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।

জিজ্ঞাসাবাদকারী সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতার জুবায়ের আনসার আল ইসলামের গোয়েন্দা শাখার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আগে জুবায়ের সংগঠনের রাহবার বা পথ প্রদর্শক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুর রাজ্যে আনসার আল ইসলামের নেতা-কর্মীরা আত্মগোপন করতে পারেন। সেখানে তারা ভারতের মনিপুর রাজ্যের কুকি বিদ্রোহী গোষ্ঠী কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) কাছে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছে-এমন তথ্যও জানতে পেরেছে। এমনকি কুকি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টাও করছে তারা। মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়ার হয়ে শেখ আব্দুল­াহ ওরফে জুবায়ের ওরফে জায়েদ ওরফে বাবেদ ওরফে আবু ওমায়ের কুকি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতো।

সিটিটিসি’র উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, গ্রেফতার জুবায়ের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। সে জুলহাজ-মান্নান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তার কাছ থেকে সাংগঠনিক চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা সেসব যাচাই-বাছাই করে দেখছি।

২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল কলাবাগানের লেক সার্কাস এলাকার ৩৫, আছিয়া নিবাস নামে একটি অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত জুলহাজ মার্কিন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা। এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল আনসার আল-ইসলামের ৫ জঙ্গি। তাদের প্রশিক্ষণ, অর্থ, অস্ত্রদাতাসহ হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল আনসার আল ইসলামের ১২ সদস্য। হত্যার ঘটনায় জুবায়ের ছাড়া গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলেন, আশরাফুল হক শিহাব, রাশেদুন্নবী তুষার ওরফে টিপু, রফিক, সিফাত ও সাইমন। এদের মধ্যে চারজন হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, গ্রেফতার জুবায়েরের সঙ্গে মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হকের যোগাযোগ ছিল। মাত্র ছয় মাস আগে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের জাকির হোসেন রোডের ৭৬বি নম্বর বাড়িতে জিয়া অবস্থান করেছিলেন জুবায়েরের সঙ্গে। ওই সময় জিয়ার মুখে দাড়ি দেখতে পাওয়া যায়নি বলে জুবায়ের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানায়। লেখক, বগার ও মুক্তমনা ব্যক্তিদের হত্যার পরিকল্পনাকারী এই মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হককে ধরিয়ে দিয়ে ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক ২০ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেন। ওই বছরের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার পর সিটিটিসি গুলশান নিকেতন আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে জিয়া অল্পের ফস্কে যায়।

সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর মেজর জিয়ার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চালানোর পর একটি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক হন তিনি। ওই সময় মেজর জিয়া সাভার সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ১৫ দিন আটক থাকার পর তাকে সাভার সেনানিবাসে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থান করার পর কৌশলে তিনি পরিবার নিয়ে সেনানিবাস থেকে বের হয়ে আমিনবাজারে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। এরপর থেকেই তিনি লাপাত্তা। এ ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ঐ সময় সাভারে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্টারের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়ার পরিবারের অবস্থান পেলেও তাকে তাকে খুঁজে পায়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। একসময় হিযবুত তাহরীরের অপারেশন কমান্ডার এই জিয়া মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসায় আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা জসিম উদ্দিন রাহমানীর সঙ্গে দেখা করে ওই সংগঠনে যোগ দেন।  সর্বশেষ জুবায়েরকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সিটিটিসি পলাতক মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়ার একটি অবস্থানের ব্যাপারে তথ্য জানতে পেরেছে। জিয়াকে আটক করা সম্ভব হলে বগার, লেখক ও মুক্তচিন্তার ব্যক্তিদের হত্যার তদন্তের নতুন মোড় নিবে।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.