বুধবার ৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ২১ নভেম্বর, ২০১৮ বুধবার

এখনো বর্ণ প্রথার দ্ব›দ্ব, বিয়ে মেনে নিচ্ছে না পরিবার

দশ বছর ধরে ওদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক। দু’জন দু’জনকে গভীরভাবে ভালবাসেন। পড়াশুনাও শেষ। তাই তারা পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যথারীতি ছেলের পক্ষ থেকে মেয়ের পরিবারের কাছে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রথম দফায় আলোচনার প্রেক্ষিতে মেয়ের বাবা জানান, ‘ আমাদের বর্ণ ও ছেলের বর্ণ এক নয়। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ি এই দুই বর্ণের মধ্যে বিয়ে হতে পারে না। কারণ আমাদের বর্ণের অবস্থান তাদের বর্ণের চেয়ে অনেক উপরে। তাছাড়া ছেলের পরিবার আর্থিকভাবে অনেক নীচে অবস্থান। আমি একজন শিল্পপতি। তাই শিল্পপতির মেয়ের সঙ্গে সমাজের নীচে অবস্থানকারী কোন পরিবারে আমার মেয়ের বিয়ে হতে পারে না।’ এরপর মেয়েকে তার বাবা টানা দুই বছর গৃহবন্দী করে রাখেন।

বেশ কয়েকটি বিয়ের প্রস্তাবও মেয়েকে দেয়া হয়। কিন্তু মেয়ে তার প্রেমের সম্পর্কে অনঢ়। বেশ কয়েকটি প্রস্তাব ভেস্তে যাওয়ার পর মেয়ের বাবা ভারতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নেন। কিন্তু মেয়ের একক প্রতিবাদে কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বিমানবন্দর থেকে পুলিশ বাবা ও মেয়েকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। ঢাকার হযরত শাহ জালাল বিমানবন্দরের সামনে থেকে মেয়ে পালিয়ে যান। শাঁখারী বাজারের একটি মন্দিরে তারা বিয়ে করেন। এরপরই শুরু হয় দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি মামলা ও জিডি। পরবর্তীতে সুধীর সাহা তার মেয়েকে ঢাকার একটি বেসরকারি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেন। এরপর থেকে তার কোন খোঁজ মিলছে না ।  নরসিংদীর বিখ্যাত সুরেশ খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অন্নপূর্ণা অয়েল মিলের মালিক সুধীর চন্দ্র সাহার এক মাত্র সন্তান লিমা রানী সাহা ও একই এলাকার মধ্য কান্দাপাড়ার রাম চন্দ্র পালের ছেলে সৈকত পালের মধ্যে বিয়েকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা চলছে।

সৈকত পালের বড় বোন বিজয়া পাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের প্রভাষক। তিনি অভিযোগ করেন, লিমার বাবা এই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি বলেই তার ভাইকে ঢাকার নীলক্ষেত এলাকা থেকে অপহরণের চেস্টা চালায়। গত ১২ জুন নীলক্ষেত সিটি কর্পোরেশন মার্কেটের সামনে তিনটি মাইক্রোবাসে করে ১০/১২ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি আসেন। অনিক দাস বাপ্পী নামে তার ভাইয়ের এক বন্ধুকে দিয়ে ফোন করিয়ে সেখানে ডেকে নেয়া হয়। অপহরণকারী চক্রে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন নরসিংদী শহর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী সোহেল ভূঁইয়া। তারা নিজেদেরকে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে সৈকতকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে চায়। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেস্টা করলে জনতা বাধা দেয়। জনতা সোহেল ভ‚ঁইয়া, জুয়েল মৃধা, সোহাগ, অনিক ও বিল্টনকে আটক করে নিউমার্কেট থানা পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনায় সৈকত পাল বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় একটি অপহরণের অভিযোগে একটি মামলা করেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, নরসিংদী সরকারী কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র সৈকত পাল। একই কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে ২০০৭-০৮ শিক্ষা বর্ষের ছাত্রী লিমা রানী সাহা। পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রথমে বন্ধুত্ব। এরপর ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যায়। দেখতে দেখতে তারা উভয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। সৈকত নারায়ণগঞ্জে একটি ফ্যাক্টরীতে কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। এরপর তাদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে উভয় পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সুধীর চন্দ্র সাহার কাছে তার মেয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। ছেলের পরিবারের বর্ণ পাল। আর মেয়ের পরিবারের বর্ণ সাহা। শাস্ত্র মতে বর্ণের ভেদাভেদে ভেস্তে যায় বিয়ের প্রস্তাব। এবার সুধীর সাহা উদ্যোগ নেন মেয়ের বিয়ে দেয়ার জন্য। অন্তত চারবার বিয়ের সম্বন্ধ আনা হয়েছিল। কিন্তু লিমার একক প্রতিবাদে প্রতিটি বিয়ের উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ছেলে পক্ষের সামনে লিমা প্রতিবাদ করে বলেন, ‘ বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে সৈকতকেই বিয়ে করব।’

এসব কারণে সুধীর চন্দ্র সাহা তার মেয়েকে নরসিংদীর ১৬৩, পশ্চিম কান্দাপাড়ার বিলাস বহুল বাড়িতে নজরবন্দী করে রাখেন। প্রায় দুই বছর পর সুধীর উদ্যোগ নেন যে মেয়েকে নিয়ে ভারতের কলকাতায় তার আত্মীয়ের বাড়িতে যাবেন। সেখানে তার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। গত ২৩ মে সুধীর চন্দ্র সাহা, তার স্ত্রী লক্ষী সাহা ও মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে আসেন। ওই দিন বিমানবন্দরে জোর করে নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদ করেন লিমা। বিমানবন্দরে পিতা ও কন্যার মধ্যে উচ্চ বাচ্য বিনিময় হয়। সেখানে ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারাও জড়ো হন। পরে তারা উড়াল দেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বিমাবন্দরে পৌঁছে লিমা হৈ চৈ জুড়ে দেন। বাবা তাকে জোর করে বিয়ে দেয়ার জন্য সেদেশে এনেছেন বলে চিৎকার করতে থাকেন। বিষয়টি ইমিগ্রেশন পুলিশের নজরে আসে। লিমা বিমানবন্দর থেকে বের হতে অস্বীকার করেন। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদেরকে বের হতে দেননি। পরদিন সকালে ফিরতি ফ্লাইটে তাদেরকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

২৪ মে সকাল ১০ টার দিকে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন শাখা লিমা আবারও চিৎকার চেঁচামেচি করেন। বিষয়টি নজরে আসায় ইমিগ্রেশন পুলিশ সুধীর, তার স্ত্রী ও লিমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একটি কক্ষে নিয়ে যায়। পুলিশের সামনে লিমা বলেন, ‘আমি প্রাপ্ত বয়স্ক। কিন্তু বাবা জোর করে তাকে বিয়ে দিচ্ছে।’ ইমিগ্রেশন পুলিশ লিমাকে বিমানবন্দর থেকে চলে যেতে দেন। কিন্তু থেকে যান সুধীর ও তার স্ত্রী। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে লিমা ফোন দেন সৈকত পালের কাছে। বিকালে তারা চলে যান শাখাঁরী বাজারের মহাবীর মন্দিরে। সেখানে তারা হিন্দু ধর্ম অনুযায়ি বিয়ে করেন। ওই দিন সন্ধ্যায় লিমার মা ফোন করে তাদের বিয়ে মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করেন। এতে লিমা রাতেই হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে তার বাবা মায়ের কাছে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে পুলিশের উপস্থিতিতে মুচলেকা দিয়ে লিমাকে তার মায়ের জিম্মায় দেয়া হয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জে তার নানার বাড়িতে। দুই দিন পর তাকে ঢাকার একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সৈকত পাল অভিযোগ করেছেন, সুধীর সাহা তার মেয়েকে জোর করে মানসিক রোগী বানিয়েছেন। এখন তাকে কোথায় রাখা হয়েছে- সে ব্যাপারে কোন খোঁজ মিলছে না। শুধু বর্ণ প্রথা ও অগাধ সম্পদের অহমিকায় তিনি এ বিয়ে মেনে নিচ্ছেনা। তাদের ভয় ভীতির কারণে তাদের সপরিবার বাড়ী-ঘর ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে বেড়া্েচ্ছন। বিষয়টি মধ্যস্থতা করতে নরসিংদীর ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এলেও সমাধান হয়নি।  নরসিংদী বাজার সমিতির একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জানান, ‘আমরা লিমা এবং সৈকতের বিষয়টি সুরাহা করার ব্যাপারে কয়েক দফা পদক্ষেপ নিলেও সুধীর বাবুর পক্ষ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা তার বাড়ীতে গেলেও তিনি গেট বন্ধ করে রাখেন। আমাদেরকে ঢুকতে দেন না।’

এ ব্যাপারে নরসিংদীর পশ্চিম কান্দাপাড়ায় সুধীর সাহার বাড়িতে এই প্রতিবেদক গেলেও তার দেখা পাওয়া যায়নি। টানা তিনদিন ধরে তার দুইটি মোবাইল ফোনে ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মঙ্গলবার রাতে এ ব্যাপারে সুধীর সাহা তার বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। এ কারণে আমি থানায় জিডি ও মামলা করেছি।’ এ কথা বলেই তিনি মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দেন। তবে সুধীর সাহা এ সংক্রান্ত থানা কোন মামলা দায়ের করেননি। গত ২৯ মে ও ৬ জুন নরসিংদী মডেল থানায় দুইটি জিডি করেন। নরসিংদী মডেল থানার ওসি সৈয়দ-উজ-জামান বলেন, সুরেষ খাঁটি সরিষা তেলের ফ্যাক্টরীর মালিক সুধীর সাহা থানায় দুইটি জিডি করেছেন। জিডি দুইটি তদন্ত করা হচ্ছে।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.