শনিবার ৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ শনিবার

মেয়েটি ফিরেছে তবে লাশ হয়ে

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: মেয়ে তো ফিরে এলো, কিন্তু লাশ হয়ে। কত কষ্টে এই মেয়েকে মানুষ করেছি। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। ঈদের দিন বিকাল থেকে মেয়ে বন্যাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কে বা কারা তুলে নিয়ে গেলো কিছুই জানতে পারলাম না। মাঝে মাঝে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বলা হতো আপনার মেয়ে ভালো আছে। কিন্তু অনেক কাকুতি-মিনতি করার পরও মেয়ের সঙ্গে একটিবারের জন্যও কথা বলতে দেয়নি। উল্টো হুমকি দিতো, আইন প্রশাসনের সহায়তা নিলে মেয়েকে মেরে ফেলবে। মঙ্গলবার সকালে টাঙ্গাইলে মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস বর্নার (১৯) মা ছায়েদা বেগম এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, মেয়ের বাবা না থাকার কারণে খালাতো ভাই ফারুক হোসেন ও খালাত ভাইয়ের চাচাতো ভাই সেরাজুল ইসলাম পুলিশের সঙ্গে মেয়েটিকে উদ্ধার করে আনতে গিয়েছিল। তারা মারা গেলো।
নিখোঁজের এক মাস পর জীবিত উদ্ধার হয়েও লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হলো কলেজছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বর্নাকে। টাঙ্গাইলে পুলিশবাহী মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে জীবন দিতে হলো তাকে। গাড়িতে থাকা তার খালাতো ভাই ফারুক (৪২) ও মামা সিরাজুল ইসলামও (৫৫) মারা যান।
বন্যার বাড়ি সোনারগা উপজেলার হাড়িয়া গ্রামে। তার বাবা মৃত আমির হোসেন। বন্যার খালাতো ভাই ফারুক হোসেন ও মামা সিরাজুল ইসলামের বাড়ি পিরোজপুর ইউনিয়নের ভাটিবন্দর গ্রামে।
নিহত বন্যার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বর্নার মা ছায়েদা বেগম। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যার সঙ্গে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে উপজেলার বারদী ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী আল আমিনের টেলিফোনে বিয়ে পড়ানো হয়। এ বছরের শেষের দিকে আল আমিনের দেশে ফেরার কথা ছিল।
মঙ্গলবারের এই ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যও আহত হন। তারা হলেন সোনারগাঁ থানার এসআই তানভীর আহমেদ (৩৩), এএসআই হাবিব (৩০), পুলিশ কনস্টেবল আজাহার (৪৫) ও মাইক্রোবাস চালক আকতার (৩৫)।
এলাকাবাসীর সূত্রমতে, রাজশাহীর বাসিন্দা পিকআপ চালক রফিকুল ইসলাম রকি নামে এক যুবকের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পরিচয় জান্নাতুল ফেরদৌস বর্নার। পরিচয়ের সূত্রধরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এক পর্যায়ে ঈদের দিন বিকালে রকির সঙ্গে রাজশাহীতে পাড়ি জমায় বন্যা। ১৮ জুন বন্যার ছায়েদা বেগম বাদী হয়ে সোনারগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডাইরী করেন।
নিহত ফারুক হোসাইন ও সিরাজুল ইসলামসোনারগাঁ থানার ওসি মোরশেদ আলম বলেন, ১৬ জুন ঈদের দিন বিকাল থেকে মেয়েটি নিখোঁজ ছিল। এ ঘটনায় তার মা শাহিদা বেগম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। মূলত প্রেমের সম্পর্ক থেকেই মেয়েটি ওই ছেলেটির সঙ্গে চলে যায়। ছেলেটি মেয়ের মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখতো। তবে, ছেলেটি তার পরিচয় গোপন রেখেছিল। সাধারণ ডায়েরির পর ছেলেটির মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে মঙ্গলবার রাজশাহী থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে সোনারগাঁয়ে ফেরার পথে টাঙ্গাইলে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ফারুকের শ্যালক মুসা উদ্দিন বলেন, ;গত ১৬ জুন বর্না অপহরণ হয়। অপহরণের এক মাস পর তার খোঁজ পাওয়া যায়। তাকে উদ্ধারের জন্য পুলিশের সঙ্গে ফারুক ও সিরাজুল ইসলাম রাজশাহীতে যায়। রাজশাহী থেকে বন্যাকে উদ্ধার করে বাড়ি ফেরার পথে টাঙ্গাইলের কুমুদিনী কলেজ মোড় এলাকায় ওই গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই বন্যাসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে বন্যা ছিল তৃতীয়। কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা যায়।

টাঙ্গাইল সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সায়েদুর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানার পুলিশ অপহরণকারীকে ধরতে রাজশাহী গিয়েছিল। অভিযান শেষে সেখান থেকে ফেরার পথে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ডের সিএনজি পাম্প থেকে গ্যাস নিয়ে সোনারগাঁয়ের উদ্দেশে রওনা হলে কুমুদিনী কলেজ মোড় এলাকায় স্পিডব্রেকারে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। এ সময় মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে মুহূর্তেই গাড়িতে আগুন লেগে যায়। তখন তারা তিনজন আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায়। এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্য আহত হয়। নিহতদের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, আহত পুলিশ সদস্যদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে একই ঘটনায় নিহত ভাটিবন্দর এলাকার ফারুক ও সিরাজুলের বাড়িতেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উপার্জনক্ষম দুই ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ফারুক হোসেনের এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে অনিক সোনারগাঁ ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। মেয়ে রিয়া মনি সোনারগাঁ পাইলট স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী।
সান্ত্বনা দিতে আসা স্বজনদের জাড়িয়ে ধরে ফারুকের স্ত্রী জাহানারা বেগম কাদঁছেন আর বলছেন কীভাবে সংসার চালাবো। কে জোগাবে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ।
ফারুকের চাচাতো ভাই সিরাজুল ইসলামের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে হাসান সোনারগাঁ ডিগ্রি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছোট ছেলে আবু সাইদ ভটিবন্দ মিথতাহুলুম মাদ্রাসার ছাত্র।
সিরাজুলের স্ত্রী তাসলিমা বেগম বলেন, সিরাজুল কৃষিকাজ করে সংসার ও দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতো। কিন্তু এখন কে দেখবে আমাদের।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.