রবিবার ৮ আশ্বিন, ১৪২৫ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রবিবার

ধরা ছোঁয়ার বাইরে হলি আর্টিজানের দুই জঙ্গি

  • চার্জশিট থেকে হাসনাত করিমের নাম বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি
  • গ্রেফতার ৭
  • তাহমিদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি

জামিউল আহসান সিপু: গুলশানের হলি আর্টিজানে সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই জঙ্গি এখনও গ্রেফতার হয়নি। মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ধারণা করছে এই দুই জঙ্গি দেশের বাইরে আত্মগোপন করেছেন। এরা হলেন জঙ্গি হামলার সামরিক কমান্ডার শরিফুল ইসলাম খালিদ ও মামুনুর রশিদ রিপন। সিটিটিসি বলছে, এই দুই জঙ্গিকে পলাতক দেখিয়ে মামলার চার্জশিট দেয়া হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ২২ জঙ্গির মধ্যে ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি ১৩ জঙ্গি বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে হলি আর্টিজানে বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ৯ জন ইটালির নাগরিক, ৭ জন জাপানি নাগরিক, ১ জন ভারতের নাগরিক, ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ও দুই জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২৩ জন নিহত হন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর অপরাশেন থান্ডার বোল্ড অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এ ব্যাপারে বলেন, হলি আর্টিজানের হামলা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল। এই ষড়যন্ত্রের মামলা এতটাই ব্যাপক ছিল যে এতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অনেক লোক জড়িত ছিল। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, কে কোন দায়িত্ব পালন করেছে, ফিজিক্যাল এভিডেন্স, কেমিক্যাল রিপোর্ট, বিশেষজ্ঞদের মতামত ইত্যাদির কারণে তদন্ত একটু সময়সাপেক্ষ হয়েছে। তবে আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়া হবে। তবে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক হাসনাত করিমকে মামলার চার্জশিটে আসামি করা হবে কি না- সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। হাসনাত রেজা করিম এখনো কারাগারে আছেন।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট অপর এক কর্মকর্তা বলেন, এই মামলায় নব্য জেএমবি’র মামুনুর রশীদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ পলাতক রয়েছেন। এদেরকে পলাতক দেখিয়ে চার্জশিট প্রদান করা হতে পারে। সন্দেহভাজন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজাউল করিমকে এই মামলা আসামী করার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। কানাডা প্রবাসী তাহমিদ হাসিব খানকে জিজ্ঞাসাবাদে তার কোন সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। তাকে এই মামলার আসামীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। প্যারা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত ৫ জঙ্গির সঙ্গে নিহত হলি আর্টিজানের শেফ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

মামলার তদন্ত সংশ্লিস্ট অপর এক সূত্র জানায়, দেশীয় জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’ এ হামলা পরিচালনা করে। হামলা পরিচালনা করেই তারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের আদলে ঘোষণা দেয়। এটিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গি সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এদের সঙ্গে বিদেশী আন্তর্জাতিক কোন জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিস্টতা মিলেনি। তবে হামলাকারীরা ভার্চুয়াল জগতে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোকে অনুসরণ করতো।

মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন বা চার্জশিট (অভিযোগপত্র) চূড়ান্ত করা হয়েছে। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও সাক্ষীদের জবানবন্দি থেকে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার আদ্যোপান্ত জানতে পেরেছে সিটিটিসি। ওই হামলায় তামিম ও সরোয়ার জাহান মানিকসহ ২২ জঙ্গির জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে সিটিটিসি ইউনিট। এই ২২ জনের মধ্যে ১৩ জন নিহত হয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে। হামলার পর প্যারা কমান্ডোদের অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত হয় রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামীহ মোবাশ্বীর, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে অভিযানে নিহত হন আবু রায়হান তারেক। ওই বছরের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অভিযানে নিহত হয় তামিম আহমেদ চৌধুরী। পরে রাজধানীর রূপনগরে মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, আজিমপুরে তানভীর কাদেরী, আশুলিয়ায় সরোয়ার জাহান মানিক, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে নূরুল ইসলাম মারজান নিহত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে অভিযানে নিহত হয় বাশারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান।

গ্রেফতারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ৭ জঙ্গি। তারা হলেন- রাকিবুল হাসান রিগ্যান, পরিকল্পনাকারী রাজীব গান্ধী, হাদিসুর রহমান সাগর, অস্ত্র সরবরাহকারী মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, পৃষ্ঠপোষক আকরাম হোসেন নিলয়, সংগঠক সোহেল মাহফুজ ও রাশেদুল ইসলাম র‌্যাশ। এদের মধ্যে পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত খালিদ ও রিপন ভারতে পালিয়ে আছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।  এ মামলায় কানাডার টরেন্টো ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসিব খান, তার বান্ধবী ফাইরুজ মালিহা, তাহানা তাসমিয়া, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএ ফ্যাকাল্টির সাবেক শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজাউল করিমের স্ত্রী শারমিনা করিম, ভারতীয় নাগরিক সাত প্রকাশ, জাপানি নাগরিকের গাড়ি চালক আব্দুর রাজ্জাক রানা, হলি আর্টিজানের নিরাপত্তা কর্মী জসিম, হলি আর্টিজান বেকারীর কর্মচারী শাহরিয়ার, সহকারী কুক আকাশ খান, ওয়েটার লাজারুস সরেন, সুমন রেজা, সবুজ, শিশির, সুহিন ও সমীর বাড়ৈ প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

সূত্র মতে, হামলার জন্য নব্য জেএমবি’র পাঁচজন ‘ইসাবা’ (হামলাকারী) বাছাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় সামরিক কমান্ডার শরিফুল ইসলাম ওরফে খালিদকে। ঢাকার সামরিক কমান্ডার আবু রায়হান ওরফে তারেক তিনজনের নাম দেন। তারা হলেন রোহান ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম ও মীর সামীহ মোবাশ্বের। আর উত্তরবঙ্গের কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী দেন শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ ও খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধনের নাম। রাজীব গান্ধী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের শরিফুল ইসলাম ওরফে ডনের নামও দিয়েছিলেন, যাকে গুলশান হামলায় না পাঠিয়ে শোলাকিয়ার হামলায় পাঠানো হয়েছিল। ওই হামলায় আহত অবস্থায় গ্রেফতার হওয়ার পর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ডন।

তদন্ত সংশি¬ষ্ট সূত্র জানায়, ইসাবা দলের ওই ছয়জন সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়েছিল। তাদের প্রথমে ঢাকার মিরপুর, কল্যাণপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা ও পাবনার জঙ্গি আস্তানায় রাখা হয়েছিল। এরপর নিবরাসসহ কয়েকজনকে ঝিনাইদহে নিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিষয়টি তদারকি করে হাদিসুর রহমান সাগর। পাঁচজনকে ঢাকায় এনে বুড়িগঙ্গায় গ্রেনেড ছোঁড়া শেখানো হয়। ২০১৬ সালের মে মাসের শুরুতে জঙ্গিদের নেওয়া হয় গাইবান্ধার যমুনার চরে। পাঁচ তরুণকে ২৮ দিন প্রশিক্ষণ দেন মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, তামিম, মারজান, রিগ্যান, খালেদ, রিপন, রাজীব গান্ধী ও মানিক। প্রধান প্রশিক্ষক জাহিদ একে-২২ রাইফেল ও পিস্তল চালানোর প্রশিক্ষণ দেন। তারেক শেখায় বোমার ব্যবহার।

আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, হামলার তিন দিন আগে নিবরাস ও রোহান ইমতিয়াজ দলের নেতাদের হলি আর্টিজানের ব্যাপারে তথ্য দেয়। ২৭ জুন তারা মারজানকে নিয়ে প্রথম হলি আর্টিজান রেকি করে। পরদিন রেকি করেন বাশারুজ্জামান, উজ্জ্বল ও পায়েল। ওই রাতেই তামিমসহ নেতারা বারিধারায় তানভীর কাদেরীর বাসায় বসে চূড়ান্ত ছক কষে। তামিম নিজেও হলি আর্টিজান রেকি করে ২৯ জুন সন্ধ্যায় রোহান ইমতিয়াজকে হামলার নেতা নির্বাচিত করে। এর আগে গুলশানের কাছাকাছি বারিধারায় বাসা ভাড়া নেয় তানভীর কাদেরী। ২০১৬ সালের ১ জুন সপরিবারে ওই বাসায় ওঠে। ৭ জুন সেখানে ওঠেন বাশারুজ্জামান চকলেট। ৮ জুন পাঁচ হামলাকারীকে নিয়ে সেখানে যায় মারজান ও তার স্ত্রী। ১১ জুন যান তামিম চৌধুরী। পরে মারজান পাঁচটি ব্যাগে পিস্তল, একে-২২ রাইফেল, চাপাতি ও বোমা নিয়ে যায়। ১ জুলাই পর্যন্ত তারা ওই বাসায় ছিলেন। বড় একটি কক্ষে পাঁচজনকে নিয়ে তামিম থাকত। ৩০ জুন সকালে তানভীর কাদেরীর বাসায় গিয়ে পরদিন হলি আর্টিজানে হামলার চূড়ান্ত ঘোষণা এবং কিছু নির্দেশনা দেয় সরোয়ার জাহান।

তদন্তকারী সূত্রে জানা যায়, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করা হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও যশোর সীমান্ত থেকে। মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ও রাশেদ ওরফে র‌্যাশ জবানবন্দিতে অস্ত্র সরবরাহের কথা স্বীকার করে। রাশেদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে মে মাসে চারটি পিস্তল আনে। সাগর ও ছোট মিজান পাঁচটি একে-২২ রাইফেল আনে একই সীমান্ত দিয়ে। মে মাসে যশোরের চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে বোমাগুলো তৈরি অবস্থায় আনেন সাগর। হামলার দিন ১ জুলাই সকালে বাশারুজ্জামান প্রত্যেকের ব্যাগে একটি করে একে-২২, একটি পিস্তল, একটি চাপাতিসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ গুলি ঢুকিয়ে দেয়। চারটি গ্রেনেড দেয় দুজনের ব্যাগে। আসরের নামাজের পরই দুই ভাগে ভাগ হয়ে পাঁচ হামলাকারী কিছু পথ রিকশায় এবং কিছু পথ হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

সাক্ষীদের জবানবন্দি ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাঁচ হামলাকারী মিলিত হয়ে হলি আর্টিজানের ফটক পেরিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে। এরপর বিদেশিদের এক স্থানে জড়ো করে একে একে ২০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। অপর একটি সূত্রে জানা যায়, তামিম ও মারজান শেওড়াপাড়ার বাসায় ইন্টারনেটে অ্যাপসের মাধ্যমে হামলার খবরের অপেক্ষায় থাকে। হামলাকারীরা হত্যাযজ্ঞ শেষ করে জিম্মিদের ফোন ও ট্যাব থেকে তামিমকে অ্যাপসে মেসেজ পাঠান।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.