বৃহস্পতিবার ১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ বৃহস্পতিবার

সিটি করপোরেশন নির্বাচন, গাজীপুরে জাতীয় নির্বাচনের আবহ

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় গাজীপুর সিটি নির্বাচন ঘিরে জাতীয় নির্বাচনের আবহ তৈরি হয়েছে। এ নির্বাচনের ওপর আগামী দিনের রাজনীতি এবং পরবর্তী নির্বাচনের অনেক কিছুই নির্ভর করছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। এজন্য বড় দুই দল— আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কারণ, ছোট ছোট দলের বেশ কিছু প্রার্থী থাকলেও মেয়র পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা) এবং বিএনপি প্রার্থী হাসান সরকারের (ধানের শীষ) মধ্যে। এজন্য দুই দলই পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৬ মাস আগে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হচ্ছে। এ কারণে সাভাবিকভাবেই এ নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের আবহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ, এ নির্বাচনের ফল পরবর্তী নির্বাচনগুলোয় প্রভাব ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া পাবলিক সেন্টিমেন্ট কোন দিকে, তারও একটা ধারণা পাওয়া যাবে। যদিও গাজীপুরের পরে রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে। তারপরও এ নির্বাচন বাকিগুলোর থেকে একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। রাজধানীর উপকন্ঠে হওয়ায় বড় দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এ নির্বাচনে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পেরেছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রথম সারির অনেক নেতাকেই এ নির্বাচনের কার্যক্রমে যুক্ত হতে দেখা গেছে। এক কথায় কেন্দ্রের একটি তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পরও জাতীয় রাজনীতির একটা আবহ তৈরি হয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সব নির্বাচনকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। গাজীপুরও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা আমাদের মতো করে পুরো প্রস্তুতি নিয়েছি। এ ক্ষেত্রে খুলনা সিটি করপোরেশনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হবে। সেখানে আমাদের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। মানুষের মধ্যে উন্নয়নের বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপি প্রার্থীরা যে শুধু কথার ফুলঝুড়ি উড়িয়েছে, তা মানুষের সামনে তুলে ধরেছে। এজন্য সাধারণ মানুষ উন্নয়নকে বেছে নিয়েছে দুর্নীতিবাজদের প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাদের আশা, গাজীপুরেও এ কাজ হবে। মানুষ উন্নয়নের পক্ষে থাকবে। আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খুলনা থেকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে গাজীপুরে। তিনি বলেন, আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গেল শনিবার রাতেও গাজীপুরের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে গাজীপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে এ ভোটের গুরুত্ব। এ সময় সব ভেদাভেদ ভুলে নৌকার প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জিততেই হবে। জয় ছাড়া অন্য কিছুই ভাবছে না তার দল।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, গাজীপুর আওয়ামী লীগ দেশের মডেল আওয়ামী লীগ। এখান থেকে বিজয়ের ঢেউ দেশের সব নির্বাচনে লাগবে। যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, যারা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করে, তাদের ভোট পাওয়ার অধিকার নেই। আগামী ২৬ জুন নির্বাচনে নৌকাকে বিজয়ী হবে বলেও আশা করেন তিনি।

এদিকে সরকারের দায়িত্বশীলরা বলেছেন, সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছে; কিন্তু তাই বলে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে চায় না। এ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার মধ্য দিয়ে বিরোধীদের হাতে কোন ইস্যু তুলে দিতে চায় না সরকার। এজন্য ভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। খুলনার মতো গাজীপুরেও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের নেতাকর্মীদের সামনেও এমন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের মন জয় করেই নির্বাচনে জেতার প্রস্তুতি নিতে হবে। ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি নয়, জনগণ যাকে ভোট দেবে তিনিই হবেন প্রকৃত নেতা। আমরা ভোট চুরির বদনাম নিতে চাই না। জনগণের মন জয় করেই নির্বাচনে জিততে হবে, ক্ষমতায় আসতে হবে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম বলেন, গাজীপুর নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আমরা শতভাগ আশাবাদী। দলের সবাই নৌকার প্রার্থী জাহাঙ্গীরের পক্ষে কাজ করেছে। খুলনা সিটির মতো এখানেও জনগণ উন্নয়নের পক্ষে জনমত দেবে। আমরা এখানে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে চাই না। স্থানীয় নেতারা এখানে প্রভাব-ভূমিকা রাখবে। আমরা বাইর থেকে নির্বাচনের খোঁজখবর রাখব। প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য আমাদের পৃথক কমিটি কাজ করবে।

জানা গেছে, খুলনার মতো গাজীপুরের প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের জন্য পৃথক কমিটি কাজ করবে। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সহযোগী ভাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারাও কাজ করবেন একইভাবে। ভোটারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিশেষ করে প্রবীণ ভোটার, যারা সহযোগিতা ছাড়া ভোট কেন্দ্রে আসতে পারবেন না— তাদের ভোট কেন্দ্রে আসতে সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি কাউন্সিল প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে কেউ যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখবে। এরই মধ্যে ৪২৫টি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের জন্য ৪২৫টি কমিটি করেছে যুবলীগসহ অনেক অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন।

এদিকে সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপিও মনে করেন গাজীপুরের ভোটের ফল শুধু এ সিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়বে। এজন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিকে তীক্ষè নজর রাখছে দলটি। তারা সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। সরকার যেন প্রভাব বিস্তার করে ফল নিজেদের পক্ষে নিতে না পারে, সেজন্য প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন। নির্বাচন কমিশনে গিয়েও তাদের বক্তব্য দিয়ে আসছেন।

রোববার গাজীপুর নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে গাজীপুর সিটির পুলিশ সুপারকে ফের প্রত্যাহার করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অনুরোধ করেছেন তারা। প্রতিনিধি দলের নেতা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আশঙ্কা আছে বলেই তো আলোচনা করছি। গাজীপুরে ১১ লাখ ভোটার। এরা যদি নির্বিঘ্নে ভোট দিতে না পারে, তাহলে তার প্রভাব সীমাবদ্ধ গাজীপুরে থাকবে না, এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও পড়বে। এর আগে সংবাদ সম্মেলন করে ভোটের পরিবেশ নিয়ে আবারও শঙ্কার কথা বলেছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, শেষ মুহূর্তের আবহাওয়া সুবিধার মনে হচ্ছে না।

এর আগে শনিবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, গাজীপুরের নির্বাচন হবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য একটা এসিড টেস্ট। আমরা দেখব তারা কী করেন? গাজীপুরের নির্বাচনে অসম্ভব জনসমর্থন রয়েছে ধানের শীষের পক্ষে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, যদি খুলনা স্টাইলে নির্বাচন করেন গাজীপুরে; এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। গাজীপুরের নির্বাচনের পর আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব, আমরা বাকি তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অর্থাৎ বরিশাল, সিলেট, ও রাজশাহীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব কিনা।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.