সোমবার ৫ ভাদ্র, ১৪২৫ ২০ আগস্ট, ২০১৮ সোমবার

প্রথা ভেঙে উত্তর বিএনপিতে চালু হলো কাইয়ুম রেওয়াজ!

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: প্রথা ভেঙে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে এবার নতুন করে চালু হলো কাইয়ুম রেওয়াজ। এমনটি মনে করছেন উত্তরের নেতাকর্মীরা। রোববার রাতে মহানগর উত্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্ততিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ২৫টি থানা ও ৫৮টি ওয়ার্ড কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, প্রত্যেক থানা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে ঢাকা মহানগর কমিটির সহসভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকের মর্যাদা লাভ করবেন। যদিও বিষয়টি নতুন এবং ‘মনোপলি’ সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তারা মনে করেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রে এ জাতীয় কোনো নির্দেশনা না থাকলেও রাজনীতির রেওয়াজ হচ্ছে জেলা বা মহানগর কমিটির অন্তর্গত থানা কমিটির সভাপতি পদাধিকার বলে মহানগর বা সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির সদস্যের মর্যাদা পেয়ে থাকেন। তাই নতুন করে এ ধরনের ঘটনা প্রথমই দেখছি।

তাছাড়া মহানগর উত্তর কমিটির কমিটির অধিকাংশ নেতা এ ধরনের মর্যাদা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ঘোষিত কমিটিকে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বলে মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে মহানগর বর্তমান নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ঘোষিত কমিটির মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক নেতা। মহানগর সভাপতি এমএ কাইয়ুম ও তার বলয়ের লোকদের একক সিদ্ধান্তে দেয়া এসব কমিটি সামনের দিনগুলোতে আন্দোলন সংগ্রামে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে বলে মনে করেন না তারা।

থানা কমিটির নেতাদের অধিক মর্যাদা দেয়ার ব্যাপারে নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি রুহুল কুদ্দুছ তালুকদার দুলু সাংবাদিকদের বলেন, সাধারণত থানা কমিটির নেতারা জেলায় বা মহানগরের কমিটিতে সদস্যের মর্যাদা পেয়ে থাকেন। মহানগরে এরকম কিছু করে থাকলে তা মনোপলি ছাড়া আর কি বলা যাবে? মহানগরে এ জাতীয় সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হয়েছে তা তারাই বলতে পারেন। এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল হক মিলন বলেন, থানার নেতাদের বা সভাপতির মর্যাদা জেলায় সদস্যের মতোই হয়ে আসছে। নতুন করে কেউ যদি অন্য কিছু করতে চায় তাহলে দলের কেন্দ্রীয় ফোরামের সিদ্ধান্ত লাগবে। দলের সিদ্ধান্ত ছাড়া এরকম কিছু করা যায় কি না তা আমি জানি না।

এ বিষয়ে মহানগর বিএনপির এক যুগ্ম সম্পাদকে বলেন, আমার বাসায় বাজার টানতো এরকম একজনকে আমাদের থানায় সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। শুধু তাই করা হয়নি তাকে আবার যুগ্ম সম্পাদক পদের মর্যাদাও দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে বর্তমান কমিটির নেতারা আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেননি। আমরা জানি থানার নেতারা মহানগরে সদস্যের মর্যাদা পেয়ে থাকেন। অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোতেও একই মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আমাদের এখানে এ ধরনের নতুন মর্যাদা চালু করতে হলে রেজ্যুলেশন করে নিতে পারত। তখন দেখা যেত কে চায় বা না চায়। রাজনীতিতে এ জাতীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে যা ইচ্ছা তাই করা যায় না। তাহলে কি বলব উনি এখানে নতুন রাজনীতির রেওয়াজ শুরু করেছেন?

জানা যায়, বিএনপির মহানগর উত্তর সভাপতি এম কাইয়ুম নিজের ইশারায় মালয়েশিয়া বসে দল চালাচ্ছেন। সাধারণ সম্পাদক তার বাইরে কিছু করতেও চান না। তাই উত্তরের সব কর্মকাণ্ড সভাপতিকে ঘিরেই পরিচালিত হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলেও বিদেশে অবস্থান করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভাসানটেক থানার সভাপতি গোলাম কিবরিয়া মাখন বলেন, মহানগর নেতারা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যে মর্যাদা দিয়েছেন সেটা দলের সেন্ট্রাল থেকে হয়েছে বলে এরকম কোনো কিছু আমি শুনি নাই। এ ধরনের কাজ করতে যতদূর জানি দলের চেয়ারম্যানের সম্মতি লাগে। আমাদের সভাপতি কাইয়ুম ভাই সেটা তারেক রহমানের নির্দেশনায় করেছেন কি না বলতে পারব না। অন্য একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, নিয়ম করা হলো মহানগরের কোনো নেতা থানায় থাকতে পারবেন না। তাহলে আমার থানার ব্যাপারে এ নিয়ম কেন মানা হলো না।

এদিকে ঘোষিত কমিটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ক্ষোভ বিক্ষোভের কথা জানান মহানগর নেতারা। মহানগর উত্তরের তিনজন সাংগঠনিক সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে ধরনের লোকদের কমিটিতে স্থান দেয়া হয়েছে তা খুবই অবমনাকর। তাছাড়া সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলেই এককভাবে মনমতো কমিটি করেছেন। উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন বলেন, আমার থানায় কমিটি করা হবে আমার সঙ্গে ‘একটি ওয়ার্ডও’ আলোচনা করা হয়নি। আমার অপর দুই সাংগঠনিক সম্পাদকের সঙ্গেও কোনো আলোচনা করেনি। নিজের বলয় বাড়াতেই এমনটা করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিজের মতো করে কমিটি করে উনারা মনে করছেন বিএনপি ক্ষমতায় এসে গেছে। কাজ কি হবে সেটা সময়ই বলে দেবে।

খিলক্ষেত থানার বিএনপি নেতা ও মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তার হোসেন বলেন, রাজধানী উত্তরাসহ উত্তরে যে সব থানা ও ওয়ার্ড কমিটি দেয়া হয়েছে তা মানতেও লজ্জা লাগে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এরা করবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন? মূলত এভাবে কমিটি করে নগরকে আরো দুর্বল করা হলো। পশ্চিম থানায় এমন একজনকে সভাপতি করা হয়েছে যিনি বিএনপির কোনো পদেই এর আগে ছিলেন না। এটা কিভাবে সম্ভব।

এদিকে উত্তরা পশ্চিম থানা কমিটির সভাপতিকে মেনে নেননি একই থানার সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত তিন নেতা। তারা সভাপতিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ক্ষোভ জানিয়েছেন। থানার সাধারণ সম্পাদক আফাজ উদ্দিন তার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেছেন, আমি মো. আফাজ উদ্দিন, (সাবেক হরিরামপুর ইউনিয়নের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর উত্তরা থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, উত্তরা থানা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক, ৫ বছর ধরে উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) সদ্য ঘোষিত উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে আবারো আমাকে মনোনীত করা হয়েছে। আমি এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করছি এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি।

আমি আরো দাবি করছি, ঢাকা মহানগর উত্তরের সংগ্রামী সভাপতি এমএ কাইয়ুম ও সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হাসান ভাইকে ভুল বুঝিয়ে (মিসগাইড করে) একশ্রেণীর অসাধু নেতা টাকার বিনিময়ে এই কমিটি গঠন করেছে সম্পূর্ণ নিজ স্বার্থসিদ্ধি এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন জেলখানার অন্ধপ্রকোষ্ঠে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ঠিক সেই সময় নেত্রীর মুক্তি আন্দোলনকে ব্যাহত করার জন্যই এই অযোগ্য নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে এক শ্রেণীর দালাল অর্থ সুবিধা নিয়ে এই কমিটি সাজিয়েছে। আমি এবং আমার কমিটির নেতা কর্মীরা সবাই এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করছি। যার রাজনৈতিক কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নাই, যে কখনো ছাত্রদল যুবদল করে নাই, দলের জন্য জেল জুলুম মামলার শিকার হয়নি, চারিত্রিকভাবে চরম বিতর্কিত এই অযোগ্য, অথর্ব সভাপতিকে আমরা সবাই মিলে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিহত করব ইনশাআল্লাহ।

সাধারণ সম্পাদকের এমন লেখা বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে নতুন সভাপতি হাজী দুলাল মানবকণ্ঠকে বলেন, আপনি আফাজের কথা শুইনেন না। আপনার জন্য আমি একটা প্যাকেট পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি আমার বন্ধু হয়ে যান। রাজধানীর বাড্ডা, ভাটারা, ভাসানটেক, বনানী, গুলশান, তেজগাঁও, খিলক্ষেত ও বৃহত্তর উত্তরার ৬টি থানার অধিকাংশ নেতা ঘোষিত কমিটি নিয়ে ক্ষোভের কথা জানান। উত্তরা পশ্চিম থানা কমিটির সভাপতি প্রার্থী অবদুছ সালাম বলেন, আমি রাজনীতি করি উত্তরা পশ্চিম থানায়, আমাকে দেয়া হয়েছে তুরাগ থানার সি. সহসভাপতির পদ। আমি তো এটা চাইনি। আমি এ পদ থেকে পদত্যাগ করব। একই কথা বলেছেন পূর্ব থানার মতিউর রহমান মতি।

এই থানায় নিষ্ক্রিয় নেতাদের দিয়ে কমিটি দেয়া হয়েছে। তাহলে আমরা এতদিন কি করলাম। বিমানবন্দরেও অযোগ্য লোককে সভাপতি করার কথা জানান সংশ্লিষ্ট থানার নেতারা। তাছাড়া দক্ষিণখানে নাজিম দেওয়ানের মতো পরিশ্রমী নেতাকে বাদ দিয়ে বিএনপি ছেড়ে দিতে চায় এমন এক নেতাকে থানার সভাপতি করা হয়েছে। তিনি বিএনপি ছেড়ে দেয়ার কথা বলে ১০ বছরের অধিক সময় ধরে দলে নিষ্ক্রিয়। সভাপতির আস্থায় থাকা এক নেতার মন জয় করেই এসেছেন সভাপতি পদে। এর বাইরে উত্তরখান থানার অধিকাংশ সিনিয়র নেতা ঘোষিত কমিটির ব্যাপারে ক্ষোভ জানিয়েছেন। মহানগরের নেতারা জানান, কমিটির কোথায় কোনো অসঙ্গতি হয়েছে তা জানিয়ে শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন করবেন তারা।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: আন্তর্জাতিক

Leave A Reply

Your email address will not be published.