শুক্রবার ৬ আশ্বিন, ১৪২৫ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

দেশীয় মদে আসক্ত মৌলভীবাজারের বেশিরভাগ চা শ্রমিক

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: মৌলভীবাজার জেলায় ৯৩টি চা বাগানের বেশিরভাগ শ্রমিক লাইনে গড়ে উঠেছে দেশীয় মদের পাট্টা। ব্রিটিশ আমল থেকেই চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের নিজস্ব মদের পাট্টার এ প্রবণতা চলে আসছে। কিছু সংখ্যাক চা শ্রমিক এ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা আয় করছে। চা শ্রমিক ছাড়াও শহর ও শহরতলীর উঠতি বয়সের যুবকরাও এসব মদের পাট্টায় আকৃষ্ট হচ্ছে। আর এই ব্যবসা থেকে প্রতিমাসের মাসোহারা প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে চলে যায়। ইতোমধ্যে শ্রীমঙ্গল র‌্যাব-৯ চা বাগানগুলোতে অভিযান চালিয়ে চোলাই মদসহ বেশ কয়েকজন মাদকসেবীদের গ্রেফতার করে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাদের সাজা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার চা বাগানের মদের পাট্টায় তৈরি চোলাই, হাড়িয়া মদ ও গাঁজার ৭০ শতাংশ চা শ্রমিকরা সেবন করে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। এসব মাতাল শ্রমিকরা রাতের বেলায় ঘরে ফিরে মারামারি ও ভাঙচুর শুরু করে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বাগান কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চা শ্রমিকরা যুগের পর যুগ ধরে বাগানে মাদক সেবনের এই ধারা অব্যাহত রাখলেও সাধারণ শ্রমিক ও যুবসমাজকে রক্ষায় মাদক উৎপাদন বন্ধ করতে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। যদিও তারা লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করছে।

সচেতন মহলের মন্তব্য, চা বাগান থেকে বৈধ দেশি মদের পাট্টা বন্ধ করে দেওয়া হলে এ অঞ্চলকে মাদকমুক্ত করা কিছুটা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। ফিনলে টি কোম্পানি ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক লাইন ঘুরে পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, চা বাগানগুলোতে ব্রিটিশ আমল থেকেই নিজস্ব উৎপাদিত চোলাই ও হাড়িয়া মদ পান করেন শ্রমিকরা। তবে বর্তমানে শ্রমিকদের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা পরিলক্ষিত হওয়ায় মদ পানকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কমেছে। বাগানগুলোতে এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক ও যুব সমাজ এসব মদ পান করেন।

ভাড়াউড়া চা বাগানের মণ্ডপ লাইনের শিক্ষার্থী চাঁদনী গড় বলেন, ‘মাল খাইয়া সন্ধ্যার পর চিৎকার করে। আবার পরিবারের লোকজনকে মারধর করে। কেউ রাস্তাঘাটে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। বেশি পরিমাণে মদ ও গাজা সেবন করে তারা মাতাল হয়ে ঝগড়াঝাটি, স্ত্রী, সন্তানদের মারধর করে।’ অবৈধ চোলাই ও পাট্টা ব্যবসায়ী প্রয়াত সরবজিত গড়ের স্ত্রী রাজ কুমারী বলেন, আমি মদ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি। স্বামী মারা যাওয়ার পর এ ব্যবসা বন্ধ করে দেই। আমি চা বাগানে কাজ করে ৮৫ টাকা হাজিরা পাই। আমার ছেলে ভোজন গড় মুদি দোকানী।

ভয়ে মাদক বিক্রির কথা অস্বীকার করেছেন এই নারী। ভাড়াউড়া চা বাগানের বড় লাইনের নারায়ণ বলেন, এখন চা বাগানের ঘরে মদ বিক্রি হয়। চোলাই ও পাট্টা মদ বিক্রি করে। বেশিরভাগ লোক মদ বিক্রি অনেক টাকার মালিক হইছে। সন্ধ্যার পর মাল খাইয়া কী যে করে। কেউ নাচানাচি করে। আবার কেউ চিৎকার করে।’ সুষমা রবিদাস জানান, চা বাগানের ঘরে ঘরে এসব মদ উৎপাদন করা হয়। নিশাদল, চিটাগুড়, হালকা পরিমাণে ইউরিয়া সার, পুরাতন ভাত এসব নানা পদার্থ দিয়ে চোলাই ও হাড়িয়া মদ তৈরি হয়।

ডানকান ব্রাদার্সের মালিকানাধীন চা বাগানের নারী শ্রমিক জনি মৃধা, পারুল কর্মি, রুপালি রিকিয়াশন, অর্চনা বাউরী, সুমা বাউরী, সুমিত্রা রিকিয়াশন জানান, তাদের স্বামীরা সন্ধ্যার পর মদের পাট্টায় গিয়ে মদ পান করে মাতাল হয়ে যান। পরে রাস্তাঘাটে ও ঘরে এসে ঝগড়াঝাটি, সন্তানদের গালিগালাজসহ চিৎকার করেন।

দেওরাজ রবিদাস, রাজদের কৈরীসহ চা বাগানের শ্রমিকরা বলেন, বাগানে উৎপাদিত মদের পাট্টায় এখন বস্তির যুবকদেরও দেখা যায়। এতে করে চা শ্রমিকদের সঙ্গে বস্তির লোকজনও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এসব মদ পান করে যুব সমাজ ধ্বংস হচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে। পরিবেশ বিনষ্ট, শারীরিক সমস্যাসহ আর্থিক মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে চা বাগানগুলোতে অবৈধভাবে মদের পাট্টা সমূহ বন্ধ করা উচিত।

চা বাগানে চোলাই মদের পাটায় মাদক পান করে চা শ্রমিকরা আসক্ত হচ্ছে। এতে আপনার করণীয় জানতে চাইলে চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের নির্বাচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের তরুণ ভাইস চেয়ারম্যান প্রেম সাগর হাজরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,কাকা আপনাকে এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে পারবো না। আমার কিছু সমস্যা আছে। কারণ জানতে চানতে চাইলে তিনি বলেন, চা শ্রমিকদের ভোটে আমি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। এখন যদি মদের বিষয়ে কথা বলতে যাই তাহলে অনেক মদের পাট্টার মালিক ও মদের সেবনকারী আমার বিরুদ্ধে কাজ করবে।’

ভাড়াউড়া চা বাগান ঘুরে চা শ্রমিকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কালিবাড়ি গেট থেকে শুরু হওয়া সবুজ ঘর ও সীতারাম ঘর, রাজারাম কাহারসহ যেসব ঘর আছে সবগুলোতেই চোলাই ও দেশি পাট্টা মদের ব্যবসা রয়েছে। বৈধ দেশি মদের পাট্টায় সপ্তাহে ২০০ লিটার মদ বিক্রির পারমিট রয়েছে। একজনের কাছে ১০ লিটার বা ২ লিটার অথবা ৩ লিটার বিক্রি করা যাবে না। তারা চা শ্রমিকের কাছে ১০ লিটার কেউ আবার ৫ লিটার করে সরবরাহ করছে। চা শ্রমিক মাদক ব্যবসায়ীরা মদ কিনে ঘরে নিয়ে বিক্রি করছে। এটা সম্পূর্ণ অবৈধ।

ভাড়াউড়া চা বাগানে দুই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী আছেন। তারা হলেন লেংড়া অমৃত ও খোকা বাবু। তাদের নামে শতাধিক মাদক মামলা আছে। প্রশাসন এদের কাছ থেকে মোটা অংকের মাসোহারা নেয়, ফলে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না।’ মৌলভীবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সুবোধ কুমার বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চোলাই মদ অবৈধ। যেটা সরকারি সেটা চোলাই মদ না, কেরু কোম্পানির সরকারি বৈধ দেশি মদের পাট্টা। জেলার চা বাগানগুলোতে ৪০টি দেশি মদের পাট্টা রয়েছে। প্রতি মাসে চা বাগানসহ সব স্থানেই চোলাই মদের দোকানে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। চা বাগানে দেশী বৈধ মদের পাট্টাগুলোর ব্যাপারে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা গেছে,শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু রনধীর কুমার দেব একটি দেশি বৈধ মদের পাট্টা সাতগাঁও চা বাগানে পরিচালনা করছেন। চ্যানেল নাইনের স্থানীয় প্রতিনিধি ইমন দেব চৌধুরী ভাড়াউড়া চা বাগানে দেশি মদের পাট্টার ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এর আগে তার বাবা প্রয়াত ইরেশ দেব চৌধুরী এ ব্যবসা করতেন।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.