শনিবার ৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ শনিবার

আওয়ামী লীগ চায় বিএনপি নির্বাচনে আসুক

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে আর সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া আসবেন। এমন বদ্ধমূল ধারণা নিয়েই নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এমনকি এ ব্যাপারে ন্যূনতম ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্তেও অটল দলটি। তবে তেমন আগ্রহ নেই দলটির নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব নিয়ে। এমনকি আন্দোলনের মাধ্যমে সহায়ক সরকারের দাবি আদায়ের হুমকিকেও অতটা গ্রাহ্যে আনছে না ক্ষমতাসীন দলটি। অবশ্য যেকোনো উপায়ে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে চায় সরকার। আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত মনে করছে, অস্তিত্ব রক্ষার কারণেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নিতেই হবে। কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধিত কোনো দল পরপর দুবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। একইভাবে এখনো গুছিয়ে উঠতে না পারায় বিএনপির পক্ষে এই মুহূর্তে কোনো ধরনের কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতা নেই- তেমন ধারণাও বদ্ধমূল ক্ষমতাসীনদের। বিশেষ করে বর্তমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকায় বিএনপির এ ধরনের দাবিকে অমূলক মনে করছে আওয়ামী লীগ। দলের নেতারা বলছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। ফলে এবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। এ ব্যাপারে দলের সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান বলেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। তাই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনা নেই। আওয়ামী লীগ সূত্রগুলো বলছে, আগামী নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে হোক- এমনটা সরকারও চায়। দলের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার তেমন নির্দেশও রয়েছে। একতরফা নির্বাচনের দুর্নাম ঘোচাতে এবার যেকোনো উপায়েই হোক বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সব ধরনের উদ্যোগও নেওয়া হবে। তবে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে ন্যূনতম ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে কারণে আন্দোলনের পথ থেকে সরিয়ে নির্বাচনমুখী করতে বিশেষ কৌশল নেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার কৌশলও নিয়েছে দল। দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির কৌশল অব্যাহত রাখা হয়েছে। নির্বাচনের পক্ষে জনমত গড়তে প্রতিদিনই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এ নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন দলের মন্ত্রী ও নেতারা। বিশেষ করে দলের শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রীরা প্রায় প্রতিদিনই শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিচ্ছেন। ঈদের ছুটি শেষে সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এ ব্যাপারে বলেন, আপনারা ডায়েরিতে লিখে রাখুন, আমি নিশ্চিত করে বলছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেবেন। তিনি আরো বলেন, ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির আগেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে এবং নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এখানে অন্য কোনো কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের অধীনেই পরবর্তী নির্বাচন হবে। নির্বাচন কিন্তু সরকারের অধীনে হবে না। তখন রুটিন কাজ করবে যে সরকার, সে সরকারের কোনো মেজর পলিসি ডিসিশনের ক্ষমতা থাকবে না। নির্বাচনকালীন যে সরকার থাকবে তারা নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী, কাজ করবে। এ ছাড়া জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় পরিচালিত হবে। এর পাশাপাশি দলের নেতারা তাদের বক্তব্যে তুলে ধরছেন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও জ্বালাও পোড়ার আন্দোলনের ফলে বিএনপির ক্ষতিকর দিকগুলো। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রায় ২০ হাজার মামলা চাঙ্গা করার প্রস্তুতি চলছে। মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা ও পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ক্ষমতাসীন নেতারা এমনও মনে করছেন, বিএনপির নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো নির্বাচনকালীন সরকারে তাদের প্রতিনিধি রাখা। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সরকারে বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের লোকেরাই থাকবে। এর বাইরে কোনো দলের প্রতিনিধি রাখার সুযোগ নেই। দলের নেতারা জানান, গত নির্বাচনে বিএনপি সংসদে ছিল। এ কারণে তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বার বার আহ্বান করেছিলেন নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু বিএনপি তাতে সাড়া না দিয়ে উল্টো সাংবিধানিক ধারাকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করেছে। নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী টেলিফোনে খালেদা জিয়াকে গণভবনে এসে আলোচনার আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া তাতে সাড়া দেননি। এখন বিএনপি সংসদে নেই। তাই তাদের নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাবেরও কার্যকারিতা নেই। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, সহায়ক সরকার বলে সংবিধানে কিছু নেই। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার হবে। এতে বিএনপিকে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাই তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করার কোনো সম্ভবনা নেই। অন্যদিকে, নির্বাচনকালীন সরকার দাবি পূরণে বিএনপি আন্দোলনের হুমকি দিলেও দলের সে সক্ষমতা নেই বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীনরা। দলের নেতাদের মতে, আন্দোলনে যাওয়ার মতো দলগত অবস্থা বিএনপির নেই। নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন। জনসমর্থনও কম। তারা মূলত নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কথা বলে নিজেদের আলোচনায় রাখতে চায়। একইসঙ্গে নেতাকর্মীদেরকে চাঙ্গা রাখার কৌশল হিসেবে বিএনপি সহায়ক সরকারের কথা বলছে। তারপরও সহায়ক সরকার দাবি থেকে দূরে রাখতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও দেশে বিদেশি কূটনীতিকদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানা গেছে। যেহেতু আওয়ামী লীগ মনে করছে আগামী নির্বাচন হবে সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে- তাই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এখন থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতিতে নেমেছে দলটি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপিকে নানা ইস্যুতে ব্যস্ত রেখে বিশেষ কৌশল নিয়েই নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতারা। দলীয়প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক মাস ধরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনসভা করছেন। উন্নয়ন আর বিএনপির অতীত ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে তিনি ভোট চাইছেন নৌকার পক্ষে। শুধু তা-ই নয়, দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদেরও তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। নির্বাচনে পাস করার বিষয়ে দল কারো দায়িত্ব নেবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। তৃণমূলের সংকট কাটাতে কাজ শুরু করেছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। জেলার নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূলের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ঈদের পরেই জেলা সফরে যাবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। বিশেষ করে ঈদ শেষে এখন পুরোদস্তুর নির্বাচনী মাঠে নামার কথা রয়েছে আওয়ামী লীগের। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, এখন সারাদেশে সভা-সেমিনার, পথনাটক, গান, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে সরকারের সফলতাসহ বিএনপির অতীত অপকর্ম তুলে ধরবে দলটি। সরকারের সাড়ে আট বছরের সাফল্য তুলে ধরতে সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। বিএনপির অতীত অপকর্মও প্রচারণার উপযোগী করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই বিলবোর্ড প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এখন জেলায় জেলায় দলীয় সভা, সেমিনার, উঠান বৈঠকের পাশাপাশি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আলোচনা, গান ও পথনাটকের মাধ্যমে প্রচার করবে দলের সাফল্য গাথা। এ ছাড়া আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি, সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি ও সংগঠনকে গতিশীল করতে সরকারের উন্নয়ন জনগণের সামনে তুলে ধরতে ঈদের পরই তৃণমূলে ঘরে ঘরে যাবেন দলের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও একাদশ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। উঠোন বৈঠক করবেন। জনমত গড়তে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তালিকা করে তাদের ভাতা দেবে সরকার। প্রত্যেক পরিবারের একজনকে চাকরির নিশ্চয়তা দেবে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে জনকল্যাণমুখী আরো বেশকিছু প্রকল্পও নেবে সরকার।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: রাজনীতি,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.