শনিবার ৭ আশ্বিন, ১৪২৫ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শনিবার

পাহাড় কাটছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: কক্সবাজারের উখিয়ায় বসতি গড়ে তুলতে নির্বিচারে পাহাড় কাটছে রোহিঙ্গারা। প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা পাহাড় কেটে মাটি সমান করছে। এছাড়া, বুলডোজার দিয়েও পাহাড় কাটা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি এড়াতে দুই লাখ রোহিঙ্গার জন্য নতুন আবাসন তৈরির নামে এসব পাহাড় কাটাছে ‘আইওএমসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা। বনবিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, পাহাড় কাটার জন্য কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। নির্বিচারে বন ও পাহাড় কাটার ফলে এ অঞ্চলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। এ কারণে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কাও করছেন তারা।

পাহাড় কাটছে রোহিঙ্গারাগত ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নাগরিকরা দেশটির সেনাবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তখন থেকে এপর্যন্ত সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে পালিয়ে আসা চারলাখসহ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ১২টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সাড়ে পাঁচ হাজার একর বনভূমিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো গড়ে ওঠার কথা বলা হলেও বাস্তবে ১০ হাজার একরেরও বেশি বনভূমিতে রোহিঙ্গারা অবস্থান করছে। তারা বসতি গড়ে তুলতে নতুন নতুন বনভূমি দখল করে গাছ কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলছে।

পাহাড় কাটছে রোহিঙ্গারাঅভিযোগ আছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা একত্রিত হয়ে পাহাড় কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করছে।বর্তমানে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোহিঙ্গা পাহাড় নিধনে ব্যস্ত রয়েছে।আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এসব পাহাড় কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছে। উখিয়ার কুতুপালং, মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, পালংখালী, বালুখালী, তাজনিমার খোলাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে শতাধিক পাহাড় কেটে বসতি গড়ার কাজ করছে রোহিঙ্গারা। পাহাড় কাটতে জনপ্রতি দৈনিক ৪০০ টাকা করে পারিশ্রমিকও পাচ্ছে তারা।

পাহাড় নিধনে নিয়োজিত রোহিঙ্গা শ্রমিক জাফর আলম বলেন, ‘আমার নেতৃত্বে ১২০০ রোহিঙ্গা শ্রমিক ‘আইওএম’র আওতায় মাটি কাটার কাজ করছি। প্রতি ঘণ্টায় ৫০ মজুরিতে দৈনিক ৪০০ টাকা পাওয়া যায়। গত এক সপ্তাহ ধরে আমরা এই কাজ করে যাচ্ছি’।

রোহিঙ্গা বসতিআরেক রোহিঙ্গা মাঝি শফিউল ইসলাম বলেন, ‘সকাল সাতটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত মোট আট ঘণ্টা মাটি কাটার কাজ করছি। কারণ, যেখানে আমরা বসতি স্থাপন করেছিলাম, সেই জায়গাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য এখানে নতুন করে বসতি স্থাপনের কাজ চলছে। মূলত, এসব বসতি ঘর তৈরির দায়িত্বে রয়েছে আইওএম।’

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ‘আইওএম’ এর পক্ষে পাহাড় কাটা কাজে নিয়োজিত সুপারভাইজার ইমাম শরিফ ঘটনার স্বীকার করে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপনে দৈনিক ৪০০ টাকা পারিশ্রমিকে তিন হাজার রোহিঙ্গা শ্রমিক এখন কাজ করছে। কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গা বসতিগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে পাহাড় কেটে আবাসন তৈরি করা ছাড়া কোনও বিকল্প নেই।’

পাহাড় কাটছে রোহিঙ্গারাপরিবেশবাদী সংগঠন কক্সবাজার বন-পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দিপু বলেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে সরিয়ে নিয়ে এ কেমন ঝুঁকিমুক্ত করতে চাইছে প্রশাসন? নতুন বসতি তৈরির অজুহাতে ‘এনজিও’রা যেভাবে পাহাড় কেটে মরুভূমিতে পরিণত করছে, তাতে মনে হয় বনভূমি সংরক্ষণের কেউ এখানে নেই। যেভাবে পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে, এতে এনজিওদের স্বার্থসিদ্ধি হলেও এলাকার মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতির দিন ঘনিয়ে আসছে। এ থেকে তখন কেউ রেহাই পাবে না। তাই এনজিদের এসব অপকর্ম ঠেকাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আলী কবির বলেন, ‘বসতি নির্মাণের জন্য প্রথম দফায় সাড়ে পাঁচ হাজার একর বনভূমি রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। কোনও ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই এটা করা হয়েছে। এজন্য বনবিভাগের কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। আর এখন নতুন করে যেসব পাহাড় কাটা হচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা না নিলে বর্ষা মৌসুমে সেগুলোও ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

পাহাড় কাটছে রোহিঙ্গারাএই বন কর্মকর্তা বলেন, ‘কক্সবাজার ত্রাণ ও শরণার্থী কমিশনার ‘আরআরআরসি, এবং আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থা ‘আইওএম’ এসব পাহাড় কাটছে।’ কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিতে সরকার আরও ৫৪০ একর বনভূমি-পাহাড় বরাদ্দ দিয়েছে। তাই ওইসব এলাকায় ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গাদের বর্ষার আগেই নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে এনজিও’রা কাজ করছে।’ তবে ঢালাওভাবে পাহাড় কাটার বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.