মঙ্গলবার ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ ২২ মে, ২০১৮ মঙ্গলবার

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: গত বছর দুই দফা বন্যায় ফসলহানির ধাক্কা এখনো পুরোপুরি সামলে ওঠা যায়নি। সরকারি-বেসরকারি দুভাবেই চাল আমদানি অব্যাহত আছে। এর মধ্যেই পণ্যটির দাম বাড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাজারে। হাওড়াঞ্চলের কোথাও কোথাও আবার বন্যাও দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে ভারি বৃষ্টিপাতে বন্যা পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা। প্রতিকূল এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরও চাল নিয়ে বিপত্তি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাড়তি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ অপর্যাপ্ত হওয়ায় কয়েকদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়তির দিকে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, অন্যতম শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ ভিয়েতনামে পণ্যটির দাম এখন চার বছরের সর্বোচ্চের কাছাকাছি। দেশটি থেকে ৫ শতাংশ ভাঙা চালের রফতানি মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে টনপ্রতি ৪৫৫-৪৬০ ডলারে। আগের সপ্তাহেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটি এ মানের প্রতি টন চাল রফতানি করেছিল ৪৪৫-৪৫০ ডলারে।

আরেক চাল রফতানিকারক দেশ থাইল্যান্ডেও এখন পণ্যটির বাজার ঊর্ধ্বমুখী। দেশটি থেকে প্রতি টন ৫ শতাংশ ভাঙা চাল রফতানি হচ্ছে ৪৩৫-৪৪৫ ডলারে। আগের সপ্তাহেই এ চাল টনপ্রতি ৪৩০-৪৩৫ ডলারে রফতানি করেছিল ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে চালের বাজার চড়িয়ে দিচ্ছে ফিলিপাইনের আমদানি চাহিদা। এর প্রভাব সারা বছরেই থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।

ভারতীয় চালের প্রধান রফতানি গন্তব্য বাংলাদেশ ও আফ্রিকায় এ মুহূর্তে চাহিদা তেমন একটা না থাকায় সেদেশে পণ্যটির দাম কিছুটা কমতির দিকে। ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়নও এক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখছে।

ভারতে গত সপ্তাহে ৫ শতাংশ ভাঙা চালের রফতানি মূল্য ছিল প্রতি টন ৪০৭-৪১১ ডলার। দেশটিতে এ সময় আগের সপ্তাহের তুলনায় চালের দাম টনপ্রতি ৫ ডলার কমেছে। অন্ধ্র প্রদেশের কাকিনাড়াভিত্তিক এক রফতানিকারক জানান, রুপির অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসায়ীরা এখন পণ্যটির দাম কিছুটা কমিয়েই ধরছেন। তবে বাংলাদেশে চালের আমদানি চাহিদা পরিস্থিতি যে কোনো সময় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের এ মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি এ বছরও বন্যার পূর্বাভাস বাংলাদেশের জন্য আবারো শঙ্কা তৈরি করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, এখন হাওড়াঞ্চলের কোথাও কোথাও বন্যা চলছে। এর মধ্যে নেত্রকোনায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হলে জুনের মধ্যভাগে বন্যা দেখা দিতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে বৃষ্টিপাতের ওপর।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ১৫ মে পর্যন্ত সাধারণত হাওড়াঞ্চলে বন্যা হয়। সে সময় পার হতে চলেছে। এরপর বর্ষা মৌসুম শুরু হবে। বন্যা পরিস্থিতি কেমন হবে সে সময়ের বৃষ্টিপাতের ওপর তা নির্ভর করবে।

বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী অর্থবছরেও চাল নিয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হতে পারে বলে জানান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এখনকার বন্যায় কেবল আউশের ক্ষতি হতে পারে। তবে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে আমনের আবাদও বিঘ্নিত হবে। কারণ জুলাই বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে আমনের আবাদ শুরু হয়ে যাবে।

বন্যার ব্যাপকতা বাড়লে চালের জন্য বাংলাদেশকে আবারো আন্তর্জাতিক বাজারমুখী হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি মিলে দেশে চাল আমদানি হয়েছে ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টন। এর মধ্যে ১০ লাখ ২ হাজার টন আমদানি হয়েছে সরকারি পর্যায়ে। বেসরকারিভাবে আমদানি হয়েছে বাকি ২৬ লাখ ৫৮ হাজার টন চাল।

তবে আগামী অর্থবছর চাল আমদানির সেভাবে প্রয়োজন হবে না বলে মনে করেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শাহাবুদ্দিন আহমদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে খাদ্যশস্যের মজুদ এখন সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। স্থানীয় বাজার থেকে এ বছর ধান-চাল সংগ্রহের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা অর্জন হবে বলে আশা করছি। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়লেও বাংলাদেশের জন্য তা কোনো সংকট তৈরি করবে না বলেই মনে করছি আমরা।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল সাড়ে ১১ লাখ টন। এর মধ্যে ৮ লাখ ২১ হাজার টন চাল। ওই সময় পর্যন্ত গমের মজুদ ছিল ৩ লাখ ২৯ হাজার টন। যদিও গত বছর সরকারিভাবে চালের মজুদ অস্বাভাবিক কমে গিয়েছিল।

প্রসঙ্গত, দেশে বোরো মৌসুমের চাল বাজারে ওঠার সময়কাল থেকেই পণ্যটির বিপণন বর্ষ শুরু হয়। সে হিসাবে প্রত্যেক বছরের মে মাসে এসে শুরু হয় চালের বিপণন বর্ষ, যা শেষ হয় পরবর্তী বছরের এপ্রিলে। এক্ষেত্রে বিপণন বর্ষের প্রথম ফসল হলো বোরো এবং শেষ ফসল আমন। অন্যদিকে জুনে অর্থবছর শেষ হওয়ায়, প্রত্যেক অর্থবছরের প্রথম ফসল ধরা হয় আউশকে এবং বোরোকে বিবেচনা করা হয় সর্বশেষ ফসল হিসেবে।

মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) ২০১৭-১৮ বিপণন বর্ষে দেশে চাল উৎপাদন প্রাক্কলন করেছে ৩ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০১৬-১৭ বিপণন বর্ষের তুলনায় এ উৎপাদন বেশ কম। গত বিপণন বর্ষে সব মিলিয়ে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার টন। তবে ২০১৮-১৯ বিপণন বর্ষে পণ্যটির উৎপাদন আবারো বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিপণন বর্ষটিতে দেশে চাল উৎপাদন দাঁড়াতে পারে ৩ কোটি ৪৭ লাখ টনে।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: অর্থনীতি,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.