শনিবার ৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ শনিবার

রমজানে প্রবাসীদের ইবাদত প্রস্তুতি

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: প্রবাস মানেই কষ্টের জীবন। জীবিকার সন্ধানে পরিবার-পরিজন ও দেশ-মাতৃভূমি ছেড়ে বহু দূরে পাড়ি জমানো। দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা। প্রবাসীরা কাজকর্মে যেমন অদম্য, ধর্মপালনেও বেশ যতাশীল। শত কষ্ট হলেও প্রবাসী মুসলিম বাঙালিরা ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগী থাকেন, সাধ্যমতো নামাজ-রোজা পালনের চেষ্টা করেন। সমাগত রমজান নিয়েও তাদের প্রস্তুতির কমতি নেই। সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, কাতার, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত পাঁচ প্রবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আমিন ইকবাল ও শামসুদ্দীন সাদী

তারাবি নিয়ে বেকায়দায় পড়ি
মুনীরুল ইসলাম সাঈদ, সৌদি আরব
মুনীরুল ইসলাম সাঈদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চান্দিনায়। সৌদি আরবের একটি মসজিদে ইমাম হিসেবে নিয়োজিত আছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। প্রবাসজীবনে রমজানের প্রস্তুতি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে মসজিদের খেদমতে নিয়োজিত আমি। আল্লাহর মেহেরবানিতে প্রবাসজীবনটা দ্বীনি কাজেই কাটে। তবু রমজানের আগে আলাদা প্রস্তুতি শুরু হয়। চেষ্টা করি, পুরোটা মাস যেন বেশি বেশি আমলে কাটাতে পারি।
আমি যেহেতু মুসলিম দেশে আছি, তাই রমজানের রোজা ও ইবাদতে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। তবে মাজহাবের ভিন্নতার কারণে তারাবি নিয়ে কিছুটা বেকায়দায় পড়ি। আমাদের হানাফি মাজহাবে তারাবি বিশ রাকাত। মক্কা-মদিনায়ও বিশ রাকাত পড়া হয়। কিন্তু আমার মসজিদে হয় আট রাকাত। এক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হয়।’

দীর্ঘ ১৮-১৯ ঘণ্টা রোজা থাকতে হয়
সাঈদুর রহমান চৌধুরী আসাদ, যুক্তরাজ্য
২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনে মসজিদের খতিব ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করছেন সাঈদুর রহমান চৌধুরী আসাদ। তার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানাধীন শাহপুরে। রমজানের প্রস্তুতি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বরকতময় এ মাসের অপেক্ষায় আছি। রমজানকে বরণ করতে সিয়াম-সাধনার লক্ষ্যে অন্যদের মতো আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রবাদ আছেÑ ‘প্রবাসীদের ঘামের টাকা/সচল রাখে দেশের চাকা।’
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রাবসীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে থাকেন। তাই রমজানের রোজা রাখতে দেশের তুলনায় প্রবাসে একটু বেশিই কষ্ট হয়। তবে আমরা যারা মসজিদ-মাদ্রাসায় ধর্মীয় দায়িত্ব নিয়ে আছিÑ কষ্ট বেশি একটা হয় না। যারা অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন, তারা অনেক সময় কাজের কারণে ঠিকমতো সাহরি-ইফতার করতে পারেন না, এমনকি মাঝেমধ্যে সাহরি না খেয়েই রোজা রাখতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘লন্ডনে অনেক বাংলাদেশি যেহেতু একসঙ্গে বসবাস করি, তাই দেশের মতোই রমজানের আমেজ থাকে। এখানে প্রচুর মসজিদ রয়েছে। প্রত্যেক মসজিদেই ইফতারের আয়েজন হয়। ইফতারের সময়টা খুব আনন্দে কাটে। তবে দুঃখজনক হলোÑ ইফতারে প্রচুর খাবার অপচয় করা হয়।
আরেকটি বিষয় হলোÑ ভৌগোলিক কারণে লন্ডনে দীর্ঘ সময় রোজা থাকতে হয়। ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা। এতে যারা শারীরিক পরিশ্রম করেন তাদের রোজা পালন ও দিন শেষে তারাবি পরা অনেক কঠিন হয়ে পরে। অনেক সময় দেখা যায়, তারাবি পড়ে বাসায় গিয়ে সাহরি করার সময় থাকে না। মসজিদেই খেজুর ইত্যাদি খেয়ে রোজার নিয়ত করতে হয়। তবু ধর্মপ্রাণ মানুষ রোজা পালনে সচেষ্ট থাকেন।’

ইফতারে আনন্দ ও বেদনার সংমিশ্রণ থাকে
আবু তাহের মিয়াজী, কাতার
দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে কাতারে আছেন আবু তাহের মিয়াজী। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের সদরে। কাতারের একটি রেডিমেড কাপড়ের দোকানে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। রমজান ভাবনায় তিনি বলেন, ‘আমরা যারা প্রবাসে থাকি, ইফতার ও সাহরি তাদের জন্য ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে আসে। কারণ পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-সন্তান ছাড়া পুরো রমজান পার করি। একা একা ইফতার ও সাহরি খেতে হয়। আমাদের দেহটা থাকে প্রবাসে, মনটা থাকে দেশে। তাই এখানে ইফতার ও সাহরিতে থাকে আনন্দ ও বেদনার সংমিশ্রণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে আমাদের দোকানগুলোয় জিনিসপত্রের দাম অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়। ডিসকাউন্ট দেওয়া হয় সব কাপড়ে। আমি ব্যক্তিগতভাবে আগেই বৈষয়িক ঝুটঝামেলা সেরে রমজানের প্রস্তুতি নিই, যাতে রমজানে কাজের চাপটা কম থাকে; ইবাদত-বন্দেগিতে সময় কাটানো যায়। দোকানেও কাজের ফাঁকে কোরআন তেলাওয়াতের চেষ্টা করি।’

ইফতারের জন্য ৩০ মিনিট
সময় পাই
মামুন চৌধুরী, সিঙ্গাপুর
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগরের আতুকুড়া গ্রামের বাসিন্দা মামুন চৌধুরী। পাঁচ-ছয় বছর ধরে সিঙ্গাপুরে একটি প্রাইভেট কোম্পানির ম্যানেজিং পদে কাজ করছেন। রমজানের প্রস্তুতি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিÑ কষ্ট হলেও সব রোজা রাখব। নামাজও সময়মতো আদায় করব ইনশাআল্লাহ। তবে আমাদের সিঙ্গাপুরে রোজা রাখা কঠিন না হলেও খুব সহজও নয়। কারণ রোজার জন্য এখানে আলাদা কোনো সুযোগসুবিধা পাওয়া যায় না। ফলে যারা ভারী কাজ করেন, তাদের অনেকের পক্ষে রোজা রাখা সম্ভব হয় না। আমার ধারণামতে, ৫০ শতাংশ মুসলিম বাঙালি কষ্ট হলেও রোজা রাখার চেষ্টা করেন।
এ দেশের শ্রমিকরা সাধারণত দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে কাজে যান। যারা রোজা রাখেন, এই খাবারটাই ইফতারের সময় খান। ইফতারের জন্য ৩০ মিনিট সময় পাই আমরা। যেদিন বাসায় ইফতার করি, সবাই মিলে খুব আনন্দের সঙ্গে করি। তবে পরিবার-পরিজনকে খুব মিস করি তখন।’

মালয়েশিয়ায়
মিশ্র সংস্কৃতি
মুহাম্মাদ কেফায়েত উল্লাহ, মালয়েশিয়া
কুমিল্লার বিপাড়া থানার বাসিন্দা মুহাম্মাদ কেফায়েত উল্লাহ। হাফেজে কোরআন ও মাওলানা। দুই বছর ধরে আছেন মালয়েশিয়ায়। শিক্ষকতা করছেন একটি মাদ্রাসায়। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়া যদিও মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র, কিন্তু এখানে সবকিছুতে ইসলামশূন্যতা প্রকট। বেশিরভাগ বাংলাদেশি যেহেতু চাইনিজ কোম্পানিতে কর্মরত, তাদের পক্ষে রোজা রাখা ও তারাবি পড়া অনেক কঠিন। তবে আমি যেহেতু মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছি, তাই আমার জন্য বিষয়গুলো সহজ। রমজান এলেই তারাবির কথা আসে। আমি দেশে ১০ বছর তারাবি পড়িয়েছি। কিন্তু এখানে আসার পরে দুই বছর পড়ানোর সুযোগ হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ, এবার তারাবির নামাজ পড়াব। সিয়াম সাধনার পাশাপাশি ছাত্রদের ক্লাসও নেব। সবকিছুর প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে শাফেয়ি মাজহাব অনুসরণ করা হয়। সরকারি মসজিদ ও বড় বড় মসজিদে বিশ রাকাত তারাবি হয়। ছোট ছোট মসজিদে অনেকে নিজেদের সুবিধার জন্য আট রাকাত তারাবি পড়ে থাকে।’

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: লাইফস্টাইল

Leave A Reply

Your email address will not be published.