বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

হৃদয় পরিচ্ছন্ন রাখার মর্যাদা

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘পাঁচটি জিনিস থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর পরিচ্ছন্ন হয় নাÑ শিরক থেকে, যা তাওহিদের বিপরীত; বেদাত থেকে, যা সুন্নাহের বিপরীত; সংশয় থেকে, যা আদেশের বিপরীত; উদাসীনতা থেকে, যা জিকিরের বিপরীত এবং প্রবৃত্তি থেকে, যা ইখলাস ও নিষ্ঠার বিপরীত।’

শাবানের প্রথমার্ধ চলে গেছে। এর দিন ও রাতগুলো চলে যাচ্ছে। মাসের আর ক’টি দিন কেবল বাকি আছে। তথাপি কিছু মানুষ হিংসা-পরশ্রীকাতরতায় লিপ্ত। অথচ আমাদের নবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে উদিত হন। অতঃপর মোশরেক ও হিংসুক ছাড়া তাঁর সব সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজা)।
উপরিউক্ত হাদিসে প্রিয় নবী (সা.) সিয়াম-কিয়াম বা নামাজ-রোজার কথা উল্লেখ করেননি। বরং তিনি নিজ উম্মতকে সম্মানিত মাস স্বাগত জানানোর প্রাক্কালে এক মহৎ বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছেন। সেটি হলো অন্তর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং রবের তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা। অতএব যে ব্যক্তি তাওহিদ প্রতিষ্ঠা ও আত্মার শুদ্ধির সমন্বয় ঘটায়, সে নিজ হৃদয়ে রহমত ও মাগফিরাত অবধারিত করে নেয়।
পরিচ্ছন্ন হৃদয়ই আল্লাহর বার্তাপরিপন্থি যাবতীয় সংশয় এবং আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া সব কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘পাঁচটি জিনিস থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর পরিচ্ছন্ন হয় নাÑ শিরক থেকে, যা তাওহিদের বিপরীত; বেদাত থেকে, যা সুন্নাহের বিপরীত; সংশয় থেকে, যা আদেশের বিপরীত; উদাসীনতা থেকে, যা জিকিরের বিপরীত এবং প্রবৃত্তি থেকে, যা ইখলাস ও নিষ্ঠার বিপরীত।’
সেটিই পরিচ্ছন্ন অন্তর, যা তাকওয়া ও ঈমানে ভরপুর। যা কল্যাণ, পুণ্য ও মহত্ত্বে পূর্ণ। যার অধিকারী সুশোভিত সব শোভন চরিত্রে। যার অন্তরলোক স্বচ্ছ ও অন্যের কল্যাণকামী। তাই তো মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন হৃদয় ও পবিত্রতম আত্মার অধিকারী হলেন নবী-রাসুলরা। যারা চেয়েছেন নিজ নিজ উম্মাহ-জাতির কল্যাণ। সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন তাদের শুভ কামনা ও সঠিক পথ প্রদর্শন এবং শিক্ষা ও হেদায়েত প্রদানে।
এই যে সম্মানিত নবীর ছেলে ও সম্মানিত নবীর দৌহিদÑ সম্মানিত নবী ইউসুফ (আ.) আপন ভাইদের এত কুকর্মের পরওÑ যা পবিত্র কোরআন আমাদের সামনে তুলে ধরেছেÑ যখন তিনি তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেন, ‘বললেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। তিনি মেহেরবানদের চেয়ে অধিক মেহেরবান।’ (সূরা ইউসুফ : ৯২)।
আর আমাদের নবী (সা.) কে তো আল্লাহ ধন্যই করেছেন তাঁর বক্ষ প্রসারিত এবং আত্মা পবিত্র করে। আল্লাহর পথে দাওয়াতে তাঁকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ কষ্ট। তারপরও তিনি ছিলেন সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের মানুষ। সবচেয়ে ক্ষমাশীল ব্যক্তি। যেমন সহি বোখারি ও মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘আমি যেন নবী (সা.) কে দেখছি, যিনি কোনো নবীর ঘটনা বয়ান করছেনÑ তাঁর জাতি তাঁকে আঘাত করেছে। গ- বেয়ে রক্ত পড়ছে। তিনি রক্ত মুছছেন আর বলছেন, হে আল্লাহ, আমার জাতিকে ক্ষমা করুন, তারা বোঝে না।’
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) হলেন নবীদের পর সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের মানুষ। আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘যারা মুহাজিরদের আগমনের আগে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’ (সূরা হাশর : ৯)।
ওহুদ যুদ্ধে নবী (সা.) তাঁর সাহাবিদের সাহস জোগান। তাদের লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেন আর বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেন। নবী (সা.) একটি তরবারি নেন আর (খাপমুক্ত করে) বলেন, ‘কে এটি আমার হাত থেকে নেবে?’ তৎক্ষণাৎ সবাই নিজ হাত প্রসারিত করে বলতে লাগেনÑ আমি আমি। নবী (সা.) বলেন, ‘কে এটি হক আদায়সহ গ্রহণ করবে?’ সবাই সেটি নিতে অগ্রসর হলো। আবু দোজানা বললেন, আমি হক আদায়সহ এটা গ্রহণ করব। অতঃপর তিনি সেটি নিলেন এবং মোশরেকদের ভেতর ঢুকে গেলেন। (মুসলিম)।
এই আবু দোজানা (রা.) এর যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, তার চেহারা হাসছিল। এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সাহায্য করার সেই মহান ক্ষণটি স্মরণ করেননি, বরং তিনি মনে করেন অন্য কথা। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে নিজের দুটি আমল সবচেয়ে আমলনামায় ভারী। একটি হলো আমি কোনো অনর্থক বিষয়ে কথা বলতাম না, অপরটি হলো আমার অন্তর ছিল মুসলিমদের জন্য পরিচ্ছন্ন।’
নবী (সা.) এর সাহাবিদের কাছে ইবাদতের আধিক্য বা পুণ্যের বৈচিত্র্য নয়, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ছিল অন্তরের পবিত্রতা ও হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা। ইয়াস বিন মুয়াবিয়া নবী (সা.) এর সাহাবিদের সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের কাছে তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ, যিনি অন্তরে পরিচ্ছন্ন ও সবচেয়ে কম পরনিন্দাকারী।’
অগ্রবর্তী সেই প্রজন্মে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা শুধু পুরুষদের নয়, নারীদেরও বৈশিষ্ট্য ছিল। যখন ‘ইফকে’র ঘটনা ঘটে, আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জয়নাবকে আমার বিষয় জিজ্ঞেস করতেন। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনিই একমাত্র আমার সঙ্গে মর্যাদায় পাল্লা দিতে চাইতেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘হে জয়নাব, (আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদ বিষয়ে) তুমি কী জানো বা কী মনে করছ?’ তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার কান ও চোখকে হেফাজত করতে চাই। আমি ভালো বৈ মন্দ কিছু জানি না। (বোখারি)।
মুস্তাদরাকে হাকেমে রয়েছেÑ আয়েশা (রা.) বলেন, ‘উম্মে হাবিবা আমাকে তার মৃত্যুকালে ডাকলেন। বললেন, আমাদের মধ্যেও সে প্রতিযোগিতা ছিল, যা সতিনদের মাঝে থাকে। আল্লাহ সেসবই ক্ষমা করেছেন এবং ছেড়ে দিয়েছেন। আমি এর সব থেকেই আপনাকে মুক্ত করছি। আয়েশা বললেন, তুমি আমার সব গোপন করেছ, আল্লাহও তোমার সব গোপন করবেন।’ এরপর উম্মে হাবিবা (রা.) উম্মে সালামার কাছেও লোক পাঠান। তিনিও তাকে একই কথা বলেন।
আমাদের পূর্বসূরি পুণ্যবান ব্যক্তিরা (রহ.) ছিলেন হৃদয় পরিচ্ছন্ন ও অন্তর পবিত্রতার বিষয়ে বদ্ধপরিকর। তারা একে দিয়েছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব। মানাকিবে ইমাম আহমদ গ্রন্থে আছেÑ হাসান বিন আবদুল্লাহ খিরাকি বলেন, আমি আহমদের সঙ্গে এক রাত কাটিয়েছি। দেখলাম তিনি না ঘুমিয়ে সকাল পর্যন্ত কাঁদলেন। আমি বললাম, হে আবু আবদুল্লাহ! রাতে আপনি অনেক কাঁদলেন। কারণ কী? আহমদ বললেন, (খলিফা) মুতাসিম বিল্লাহ আমাকে যে প্রহার করেছিল তা মনে পড়ে। এদিকে (নামাজের তেলাওয়াতে) আমার সামনে গবেষণায় আল্লাহর এই বাণী আসেÑ ‘আর মন্দের প্রতিফল তো অনুরূপ মন্দই। যে ক্ষমা করে ও আপস করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে; নিশ্চয়ই তিনি অত্যাচারীদের পছন্দ করেন নি।’ (সূরা শূরা : ৪০)। তখন আমি সিজদায় চলে গেছি আর সিজদায় তাকে আমার ওপর চালানো অত্যাচার ক্ষমা করে দিয়েছি।
ইমাম আহমদ (রহ.) বলতেন, ক্ষমাই উত্তম। তোমার জন্য তোমার কোনো মুসলিম ভাইকে আজাব দিলে সেটা তোমার কোনো উপকারে আসবে না। বরং তোমার উচিত ক্ষমা করা এবং ভুলে যাওয়া। এতে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন, যেমন তিনি ওয়াদা করেছেনÑ ‘তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষক্রটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।’ (সূরা নূর : ২২)।
শরিয়ত সবসময় চেয়েছে তার অনুসারীদের হৃদয় পরিচ্ছন্ন করতে। এজন্যই নামাজে কাতার সোজা করতে বলা হয়েছে, একজনের দরদামের ওপর অন্যকে দরদাম করতে এবং একজনের বিয়ের প্রস্তাবের ওপর আরেকজনকে প্রস্তাব দিতে নিষেধ করা হয়েছে। যাতে একের ব্যাপারে অপরের অন্তরে কিছু না ঢোকে। সহি মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক সোম ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয়। তখন প্রত্যেক বান্দাকেই ক্ষমা করে দেওয়া হয়, যারা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে না। শুধু ওই ব্যক্তি ছাড়া, যার ঝগড়া রয়েছে অন্য ভাইয়ের সঙ্গে। বলা হয়, এদের দুজনকেই অবকাশ দাও, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে নেয়।’  অন্তর পরিচ্ছন্নতা আসলে নেককারদের বৈশিষ্ট্য। রোজা, ইখলাস ও কোরআন তেলাওয়াতে দ্বারা মানুষের হৃদয় পরিচ্ছন্ন হয়। ১৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: লাইফস্টাইল

Leave A Reply

Your email address will not be published.