রবিবার ৮ আশ্বিন, ১৪২৫ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রবিবার

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কতদূর?

মাছুম বিল্লাহ: নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী ও দশ অস্থায়ী সদস্যের প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও সমাধানের উদ্দেশ্যে তিন দিনের বাংলাদেশ সফর করে গেল। এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য দেশের কোনো সংকটস্থলে যাওয়ার ঘটনা বিরল। তাই আশায় বুক বেঁধে আছে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে আসা এবং স্বজন-প্রিয়জন হারানো, আতঙ্কিত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত ও ধর্ষিতা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশও একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের অপেক্ষায় আছে। প্রতিনিধি দল ৩০ এপ্রিল মিয়ানমারের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। যাওয়ার আগে বাংলাদেশকে জানিয়ে যায়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে রোহিঙ্গা ইস্যু। তবে দ্রুত এর কোনো সমাধান নেই। এটি একটি মানবিক সংকট ও মানবাধিকার ইস্যু। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা কাজ করবেন। নৃশংসতার দায়ে মিয়ানমারকে জবাবদিহিতায় আনার উদ্যোগে চীন ও রাশিয়া বাধা বলেও তাদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যদিও ওই দুই দেশের সদস্য ছিলেন প্রতিনিধি দলে। তাই তারা এ-ও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিরাপত্তা পরিষদকে নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী না হতে। এতবড় গুরুত্বপূর্ণ সফর, বিশ্ব সংস্থার এত শক্তিশালী একটি দল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের কান্নার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করার পরও যদি এ ধরনের বার্তা হয় তাহলে নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষ কোথায় যাবে, কার কাছে চাইবে বিচার?

প্রতিনিধি দল মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সেনা নেতৃত্বের বিপরীতমুখী অবস্থান দেখল। তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি বললেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তার সরকার তৈরি। তবে প্রত্যাবাসনে গতি আনতে হলে বাংলাদেশের আরও সহযোগিতার প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ আবেদনের যে ছক পূরণ করে পাঠিয়েছে, তা অসম্পূর্ণ অর্থাৎ এটি একটি টালবাহানা। রাজনৈতিক সরকারগুলো বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে সেনা সরকার বা সেনাবাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি ব্যতিক্রমী কিছু দেশ ছাড়া। আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারত এ ধরনের ব্যতিক্রমী একটি উদাহরণ। তার উল্টো অবস্থান পাকিস্তানে। সেখানকার জনগণ সারাজীবনের ইতিহাসে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র চোখে দেখেনি। সীমিত সময়ের জন্য গণতন্ত্রের দেখা মিললেও তা-ও ছিল ছদ্মবেশী সেনা শাসন। মিয়ানমারেরও একই অবস্থা। প্রায় পুরো সময়টাই সেনা শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট প্রশাসন। সেখানে সু চির কথা তারা কেন শুনবেন? তারপরও আমরা আশা করেছিলাম সু চি সত্যের পক্ষে কথা বলবেন। সেনা শাসনের জাঁতাকলে তার রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে অন্তরীণ অবস্থায়। আন্তর্জাতিক কমিউনিটির চাাপেই শেষ পর্যন্ত সেনা সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এবারও যদি রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তিনি সত্যের পক্ষে কথা বলতেন, আন্তর্জাতিক কমিউনিটি, গোটা বিশ্ব তাকে আরও সম্মানের আসনে বসাতেন। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করলাম, তিনি সেটি না করে ‘সেনাসরকারের সুরে’ কথা বলে আসছেন সেই প্রথম থেকেই। গোটা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ এবং গণতন্ত্রী জনগণ অবাক হয়েছে তার আচরণ ও ভূমিকায়। অন্যদিকে দেশটির সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারলে মিন অং হ্লাইং অভিযোগ করেছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে রাখাইনের সংকট জটিল হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের কাছ থেকে এ ধরনের কথাই আমরা শুনব। তা না হলে এতবড় সংকট তারা কীভাবে তৈরি করলেন? মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সেনা নেতত্বের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রোহিঙ্গা সমস্যা যে আরও দীর্ঘায়িত হবে নেপিদোতে পৌঁছেই নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা বুঝতে পেরেছেন। আর তাই তারা বিলম্ব করেই কক্সবাজারে এসেছিলেন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ করার সময়ও একই কথা বলেছেন যে, নিরাপত্তা পরিষদের কাছ থেকে দ্রুত এবং জাদুকরী কোনো সমাধান যেন আমরা আশা না করি। তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ওপর চালানো যে বর্বর হামলা ও নির্মমতার কথা জেনেছেন, তা বেমালুম অস্বীকার করেছেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ইতিহাসে ধর্ষণের কোনো ঘটনা নেই। কারণ সংস্কৃতি আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষণ অমর্যাদার বিষয় এবং যারা দোষী সাব্যস্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, বৌদ্ধ ধর্মের যে ‘অহিংস বাণী’ তার ধারে কাছেও কি আছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিবেশীরা? যদি থাকত তাহলে তাদের ওপর তো ইতিহাসের বর্বরোচিত হামলা করা হতো না, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলা হতো না। তারপর সেনাবাহিনীর কথা? তাদের কাছে কীসের ধর্ম, কীসের করুণা আর কীসের মায়াদয়া? তাদের হাতে আছে অস্ত্র, নির্দেশ আছে উপরের আর মনে ছিল পশুত্ব। অবারিত সুযোগ এসেছে এবং সেই সুযোগে তাদের আদিম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করেছে রোহিঙ্গা নারীদের ওপর। শিশু থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধাও রেহাই পায়নি এই পশুদের হাত থেকে। গোটা বিশ্ব বিভিন্ন মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছে মিয়ানমার সেনাদের সেই পশুত্ব, নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা। কিন্তু প্রথম থেকেই সেনাপ্রধান এসব কিছু অস্বীকার করে আসছেন, আর তথাকথিত সভ্য দুনিয়া তাদের সেই কথা শুনেই আসছে। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরাও সেই একই কাজ করলেন, একইভাবে তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন। আমাদের প্রশ্ন, নিরাপত্তা পরিষদ কীসের জন্য? কাদের জন্য? ভুক্তভোগীরা প্রতিনিধি দলের কাছে সেনাবাহিনীর যে মর্মান্তিক বর্ণনা দিয়েছেন আর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, মিডিয়ার কল্যাণে পৃথিবীর মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে। সেনাপ্রধান কীভাবে সেগুলো অস্বীকার করছেন? তাদের মধ্যে দুটি স্থায়ী সদস্য দেশ কেন এই সত্যকে লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছে? তারা কি পৃথিবীতে কোনো সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান না? নিজেদের সামান্য স্বার্থের জন্য কিংবা আদর্শিক কারণেই কি তারা এত বড় সত্যকে আড়াল করবেন?

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের কাজের ধরন ভিন্ন। তারা শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখভাল করে। রেহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নৃশংসতার বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা নিশ্চিত হতে পেরেছে কি না জানতে চাইলে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত বলেন, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ তদন্ত, মানসম্মত উপায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এটি নির্ধারণ করা সম্ভব। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সেগুলো পর্যালোচনা করে। এটি কোনো আইনি কাঠামো নয়। ভেটো ক্ষমতার বাইরে যায় নিরাপত্তা পরিষদে এই ইস্যুতে জবাবদিহিতার কাঠামো সৃষ্টি করা অত্যন্ত কঠিন বলে তারা আমাদের ব্যাখ্যা দিয়ে গেলেন। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের চারটি দলের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেন। এ সময় রোহিঙ্গারা তাদের কাছে নৃশংসতার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তারা মন্তব্য করেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের ভয়াবহতা কতটা, তা বাংলাদেশে না এলে বোঝা যেত না। তাই এখানে আসাটা পরিস্থিতি বুঝতে এবং তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে সহায়ক হবে। তারা তুমব্রুর শূন্যরেখায় গিয়ে জানতে চান রোহিঙ্গারা শূন্যরেখায় কেন? রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, তারা জন্মসূত্রে মিয়ানমারের নাগরিক। এই শিবিরের পেছনেই রাখাইন রাজ্যে তাদের বসতবাড়ি। নাগরিত্ব প্রদানসহ রাখাইন রাজ্যে নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা পেলে এই শিবিরের সব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যাবে। ফেরত না যাওয়া পর্যন্ত তারা শূন্যরেখাতেই থাকতে চায়। এতসব প্রতিষ্ঠিত সত্যের পরও, এত মর্মান্তিক ঘটনা শোনার পরও নিরাপত্তা পরিষদ এত বড় মানবিক সংকটকে কেন আরও দীর্ঘায়িত হতে দেবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

প্রায় ২৮ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিয়ানমারে এখন মাত্র ৪ লাখ সদস্য অবশিষ্ট আছে। এ সংখ্যা মোট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশেরও কম। কখনও সন্ত্রাসী বলে, অবৈধ অভিবাসী বলে, কখনও দাঙ্গার অজুহাতে নির্বিচার গণহত্যা চালানো হয়েছে তাদের ওপর। এর মাধ্যমেই প্রায় ২৪ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এখনও যারা মিয়ানমারে আছেন, তারাও নাগরিকত্ব, কর্মসংস্থান, স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার ইত্যাদি ন্যূনতম সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের বিয়েশাদিও নির্ভর করে কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর। মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৮৫ শতাংশই দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের অকার্যকর ভূমিকার কারণেই এটি হয়েছে বলতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে চীন ও রাশিয়া রোহিঙ্গা সমস্যাকে বৈশ্বিক সমস্য হিসেবে দেখতে চাইছে না, তারা এটিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে দেখছে। সরেজমিন দেখার পরও তাদের এ মনোভাবের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, তার অর্থ হচ্ছে- সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হবে; কিন্তু বিশ্বশান্তির জন্য, মানবতার জন্য সেটি কি আমাদের হতে দেওয়া উচিত?

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক ২৭ এপ্রিল ২০১৮ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলার জন্য ৯৫ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের তহবিল জোগান দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে মিলেছে মাত্র ৯ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আশ্রিত রোহিঙ্গা ও ঝুঁকিতে থাাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলে প্রায় ১৩ লাখ লোকের চাহিদা মেটাতে ওই তহবিল প্রয়োজন। জাতিসংঘের এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু খাতে বিভিন্নভাবে অর্থ ব্যয় করে, এই মানবিক সংকট যথার্থভাবে মোকাবিলা করার জন্য জাতিসংঘের এ অনুরোধকে সবাই অগ্রাধিকার দেবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষীয় চুক্তি হয়, সে অনুযায়ী ২৩ জানুয়ারি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মিয়ানমার এখন তাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, বিভিন্ন টালবাহানা করছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদের মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভেস্তে যেতে পারে সব উদ্যোগ। কিন্তু কী করবে নিরাপত্তা পরিষদ? তাদের কথা হচ্ছে, এটি কঠিন বিষয়, সহসাই এর সমাধান হচ্ছে না। বিষয়টি তাহলে কতকাল ঝুলে থাকবে?

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৫টি দেশ সদস্য। তাদের মধ্যে পাঁচটি দেশ হচ্ছে স্থায়ী সদস্য। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। এই পাঁচ দেশের রয়েছে ভেটো ক্ষমতা অর্থাৎ ‘আমি মানি না’ বলার ক্ষমতা। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের এ ক্ষমতাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও কোন্দলকে দীর্ঘস্থায়ী করে রেখেছে, বয়ে নিয়ে এসেছে অশান্তির দাবানল আর অনেক সত্যকে যুগ যুগ মাটিচাপা দিয়ে রেখেছে। রোহিঙ্গা সংকটেরও কি সেই একই দশা হবে? নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বলিভিয়া, ইকুটোরিয়াল গিনি, ইথিওপিয়া, কাজাখস্তান, কুয়েত, নেদারল্যান্ডস, পেরু, পোলান্ড, সুইডেন ও আইভরি কোস্ট। নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট পেরু। এসব দেশের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ সফরকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। তাদের কাছে আমরা প্রকৃত সমাধান আশা করছি। একইভাবে ৪ ও ৫ মে ঢাকায় ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকের আগে ৪ মে সংস্থার সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কক্সবাজারে নিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। ৫৭ জাতির ওআইসি গ্রুপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ৭০টি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।

যুগ যুগ ধরে বাস করা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকার বলছে, তারা ওই দেশের নাগরিক নন। তারা তো অন্য গ্রহ থেকে আসেনি। রাখাইনেই তো তাদের জন্ম। রাখাইনই তাদের দেশ। তারা পৃথিবীর বাসিন্দা। তারা তো অন্য কোনো প্রাণী নয়। তারা তো মানুষ। মানুষ হিসেবে তারা এই পৃথিবীতে প্রকৃতির দেওয়া ভূমিতে বাস করতে পারবে না? যারা তা করতে দিতে চায় না তারা তো মানবতার শত্রু, বিশ্বশান্তির শত্রু, পৃথিবীর শত্রু। বিশ্ব সংস্থাকে এই মানবতার শত্রুদের বিচার করতেই হবে। রোহিঙ্গাদের কোথায় পাঠাতে চাচ্ছে মিয়ানমার? কেন? এমনও তো নয় যে, মিয়ানমার জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেছে, তারা অতিরিক্ত জনস্যংখ্যার ভার আর সইতে পারছে না, তাই ছলেবলেকৌশলে তাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাঠাতে হবে। কোথায় মানবতা? কোথায় ধর্ম? কোথায় বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মোড়লরা? কোথায় সভ্যতার ধারকবাহকরা? বিশ্বে মানবতা কি ভূলুণ্ঠিত হতেই থাকবে? মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা তাদের আবাসভূমিতে কি নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে না? তারা কি ফিরে পাবে না তাদের হারানো বাড়িঘর? তাদের হারানো শিশু-স্বজন-প্রিয়জনদের তো আর কোনোদিন ফিরে পাবে না। তারা কি ফিলিস্তিনি জনগণের মতোই বাস্তুহারা হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নগুলো ওআইসির প্রতিনিধি দলের কাছে, নিরাপত্তা পরিষদের কাছে, বিশ্ব বিবেকের কাছে।

-মাছুম বিল্লাহ

ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

masumbillah65@gmail.com

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: খোলা বাতায়ন,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.