শুক্রবার ৬ আশ্বিন, ১৪২৫ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার

ব্যাংক ঋণে সুদ কমছে না, বাড়ছে

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে (একক অঙ্কে) নামিয়ে আনার সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যাচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট সুদের হার কমাতে দিচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চে সুদের হার বেড়েছে।
যদিও ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ তহবিল বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সুযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশ করা এবং এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ করা হয়েছে। তারপরও ঋণের সুদহার বাড়ছে এবং তা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি হওয়াটাই সুদের হার না কমার অন্যতম কারণ। খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চয় বা প্রভিশনিং বেশি রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের ব্যয় আরও বেড়ে যায়। এছাড়া, আমানত সংগ্রহ করতে সুদ দিতে হচ্ছে ১২ শতাংশের ওপরে। ফলে ইচ্ছে করলেও সুদের হার কাঙ্ক্ষিত হারে কমছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি, বেসরকারি কিংবা বিদেশি সব খাতের ব্যাংকই ঋণের সুদ বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্চ মাসে দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়িয়েছে। দেশের ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে সব কটিতেই এখন দুই অঙ্কের সুদ গুনছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে শিল্পঋণ পেতে ব্যবসায়ীদের ২২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে।

এদিকে, বেশিরভাগ ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানোয় মার্চে ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। যা ফেব্রয়ারি মাসে ছিল ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ফলে একমাসের ব্যবধানে ঋণের সুদহার বেড়েছে দশমিক ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, মার্চে ব্যাংকিং খাতে আমানতের গড় সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি মাসে যা ছিল ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। ফলে একমাসের ব্যবধানে আমানতের গড় সুদহার বেড়েছে দশমিক ১২ শতাংশ। ফলে মার্চ মাসে ঋণ ও আমানতের সুদ ব্যবধানও (স্প্রেড) বেড়ে গেছে। এ মাসে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ। যা ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমানতে সুদ বাড়লে ঋণেও সুদ বাড়বে। তবে ব্যাংকগুলো এক শতাংশ আমানতের সুদ বাড়ালে ঋণের সুদ বাড়ায় দেড় থেকে দুই শতাংশ হারে। এছাড়া, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নজরই থাকে অতিরিক্ত মুনাফার দিকে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘খেলাপি আদায় বাড়ানো এবং ব্যাংকগুলোর অপ্রয়োজনীয় খরচের লাগাম টানতে পারলেই কেবল সুদের হার কমতে পারে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি মালিকানার আটটি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি—দুই ধরনের ঋণেই সুদের হার গুনছেন ১৩ শতাংশ হারে। একইভাবে ব্যবসায়ীদের উচ্চ সুদ হার গুনতে হচ্ছে শিল্পের মেয়াদি, চলতি ও এসএমই ঋণের ক্ষেত্রেও। সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১১ শতাংশ হারে। অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) সুদ নিচ্ছে ১১ থেকে ১২ শতাংশ হারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিল্পঋণের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি হারে সুদ আরোপ করছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যেসব ব্যবসায়ী ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন তাদের কারও কারও সুদ গুনতে হচ্ছে ২২ শতাংশ হারে। বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংক এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ হারে। বড় উদ্যোক্তাদেরও দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি দুই ধরনের ঋণেই সুদ গুনতে হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হারে।

সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ঋণের ওপরে সুদ হার না বাড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘ব্যাংক ঋণের সুদ হার বেড়ে যাওয়া ব্যবসার জন্য নেতিবাচক। এমনকি দেশের জন্যও তা খারাপ।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার তাগিদ দিয়েছেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ব্যাংকগুলোকে কেবল মুনাফা বৃদ্ধির কথা না ভেবে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সুদের হার কমিয়ে আনার তাগিদ দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্পের জন্য এককভাবে সব ব্যাংক ব্যবসায়ীদের দুই অঙ্কের সুদে ঋণ দিলেও গড়ে দুই অঙ্কের ঘরে ঋণ দেওয়া ব্যাংকের সংখ্যা এখন ৪৪টি। গত ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ২৯টি। আর জানুয়ারিতে ছিল ১৯টি । চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই সুদের হার বৃদ্ধি করা শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। সাত-আট মাস আগে ব্যাংকগুলো ৩ থেকে ৬ শতাংশ সুদে আমানত পেলেও এখন ১২ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। কোনও কোনও ব্যাংক ১২ শতাংশেরও বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। ফলে ওই ব্যাংক বাধ্য হয়েই উচ্চ সুদে ঋণ সুদ বিতরণ করছে।

এ প্রসঙ্গে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক আবদুস সালাম মুর্শেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের সমস্যা হচ্ছে ঠিকই, তবে বিষয়টি সমাধানের জন্য চেষ্টা চলছে।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি ঋণে আগে থেকেই সুদের হার দুই অঙ্কে ছিল।’ তিনি মনে করেন, ব্যাংকের খেলাপি প্রবণতা কমানো গেলে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.