বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

শবেবরাত : ক্ষমার অবারিত সুযোগ

বিশেরবাঁশী ডেস্ক: পবিত্র শাবান মাস হাজির হয় রমজানের পূর্বাভাস নিয়ে। শাবান রমজানের প্রস্তুতির মাস। শাবানের শেষ কয়েকদিন ছাড়া নবীজি (সা.) বেশি বেশি রোজা রাখতেন। এর কারণ সম্পর্কে নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ মাসে আল্লাহ তায়ালার কাছে মানুষের কর্ম ওঠানো হয়। আমি চাই যে রোজা রাখা অবস্থায় আমার আমল ওঠানো হোক।’ (নাসাঈ : ৪/২০১)। তাই নফল রোজা, ইবাদত ও রমজানের প্রস্তুতির মাস হিসেবে শাবানের অনেক গুরুত্ব রয়েছে।
মধ্য শাবানের রাত আমাদের কাছে ‘শবেবরাত’ হিসেবে পরিচিত। দুঃখজনক হলো, বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে পড়েছে শবেবরাত। কেউ কেউ তো শবেবরাতের ফজিলতের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তার পুরস্কার থেকে মাহরুম হচ্ছেন। আবার কেউ শবেবরাতকে ‘ভাগ্য রজনী’ বানিয়ে একে বিভিন্ন বানোয়াট আনুষ্ঠানিকতায় তা পালন করছেন। এ কথা সত্য যে, কোরআন-সুন্নাহর পরিভাষা ‘শবেবরাত’ নয়, ‘মধ্যশাবানের রাত’। আমাদের সমাজে শবেবরাত বলতে যে রাতটিকে বোঝানো হয় তার (১৫ শাবানের রাত) ফজিলত নির্ভরযোগ্য হাদিসে প্রমাণিত।
এ রাতে কী আমল, তা সম্মিলিত, নাকি একাকী; এ রাতের বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামাজ আছে কি না তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে; কিন্তু এ রাতের ফজিলত অস্বীকারের সুযোগ নেই। হাদিসে এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য হাদিস দ্বারা এ রাতের ফজিলত প্রমাণিত। আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও মুশাহিন (বিদ্বেষ পোষণকারী) ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১/৪৪৫)। মুহাদ্দিনরা এ হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। বিখ্যাত হাদিস গবেষক নাসিরুদ্দিন আলবানির (রহ.) মতে, এ হাদিসটি হাসান। (সিলসিলাতুল আহাদিস আস সহিহাহ : ৩/১৩৫)। সুতরাং মধ্য শাবানের রাত বা শবেবরাত আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ক্ষমার এক বিশেষ সুযোগ, এতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষ অজ্ঞতাবশত এ রাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে একে ‘ভাগ্যরজনী’ মনে করেন, যা সম্পূর্ণ হাস্যকর। এ রাতে হায়াত, মউত, রিজিক ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয়Ñ এ ধারণা কোরআন-হাদিসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। সূরা দুখানের ৩-৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ এ রাতকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চই আমি একে (পবিত্র কোরআন) এক মোবারক রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, আমি তো সতর্ককারী। এ রাতেই প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়।’ (সূরা দুখান : ৩-৪)। এখানে একটি ব্যাপার স্পষ্ট যে, যে রাতে (লাইলাতুম মাবারাকা) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্থির হয়, তা হলো কোরআন নাজিলের রাত। আর কোরআনুল কারিম কোন রাতে নাজিল হয়েছে তা সচেতন মুসলিমমাত্রই জানার কথা। কারণ কোরআন কোন রাতে নাজিল হয়েছে, তা কোরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে (কোরআনকে) লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ করেছি।’ (সুরা কদর : ১)। সুতরাং এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্থির হওয়ার যে রাতের কথা বলা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে লাইলাতুল কদর। লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (মধ্য শাবানের রাত বা শবেবরাত) নয়। সূরা দুখানের তৃতীয় আয়াতের ‘লাইলাতুম মোবারাকা’র ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির বলেন, ‘কোনো কোনো লোক এ কথাও বলেছেন, যে মোবারক রজনীতে কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ হয় তা হলো শাবানের পঞ্চদশতম রজনী। এটা সরাসরি কষ্টকর উক্তি। কেননা কোরআনে স্পষ্ট ও পরিষ্কার কথা দ্বারা কোরআনের রমজান মাসে নাজিল হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘রমজান ওই মাস যাতে কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ করা হয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১৬/৬১০)।
মধ্য শাবানের রাতের ফজিলত অস্বীকার করা অথবা এর ফজিলত স্বীকার করতে গিয়ে একে ‘ভাগ্যরজনী’ বানিয়ে ফেলা দুটোই বাড়াবাড়ি। এ দুই ছাড়াছাড়ি ও বাড়াবাড়ি ছেড়ে ভারসাম্যপূর্ণ মাধ্যমপন্থা হলো এ রাতকে ক্ষমার রাত মনে করা। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা এ রাতে তার বান্দাদের ক্ষমা করে দেবেন। তবে মুশরিক এবং হিংসাপোষণকারীকে এ রাতেও আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না। উল্লিখিত হাদিসে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, মধ্য শাবানের রাতে ক্ষমা পাওয়ার জন্য শর্ত হলো অন্তরকে শিরক ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে খালি করা। কেউ যদি সারারাত নফল নামাজ পড়ে; কিন্তু তার অন্তরকে এ দুই জিনিস থেকে মুক্ত না করে তাহলে সে ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত হবে না। আবার কেউ যদি এ রাতে কোনো নফল নামাজ নাও পড়ে; কিন্তু তার অন্তরকে শিরক ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত করে তাহলে হাদিস অনুযায়ী তার ক্ষমা পাওয়ার আশা আছে। অবশ্য সে নফল ইবাদতের সওয়াব থেকে মাহরুম হবে।
মধ্য শাবানের রাত আমাদের একটা সতর্কবার্তা দিয়ে যায়, আল্লাহ তায়ালা যেমন শিরক ক্ষমা করেন না, তেমনি কোনো মুসলমান যদি অন্য ভাইয়ের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে তা-ও আল্লাহ ক্ষমা করেন না। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় গোনাহ হলো আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে কাউকে শরিক করা। আর শবেবরাতের হাদিসে সেই শিরকের সঙ্গেই হিংসা-বিদ্বেষকে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতময় এ সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে মধ্য শাবানের রাতকেন্দ্রিক এ হাদিসখানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজ জীবনে ভিন্নমত বা মতবিরোধ থাকতেই পারে। তবে ভিন্নমত, বিরোধ আর হিংসা-বিদ্বেষ এক নয়। কারও কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও তার হিংসা বা অমঙ্গল কামনা করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে বৎস, তুমি এমনভাবে জীবনযাপন করবে যে, সকালে সন্ধ্যায় (কখনও) তোমার অন্তরে কারও প্রতি ধোঁকা বা অমঙ্গল কামনা থাকবে না। এটা আমার সুন্নত।’ (তিরমিজি : ৫/৪৬)। কারও অমঙ্গল কামনা করা মারাত্মক গোনাহ, জাহান্নামে যাওয়ার কারণ আবার কাউকে ভালোবাসা এক মহান ইবাদত, জান্নাতে প্রবেশের কারণ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘ঈমানদান না হওয়া পর্যন্ত তোমরা কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা পরস্পর পরস্পরকে না ভালোবাসা পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না…।’ (মুসলিম : ১/৭৪)।
আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে ক্ষমা পেতে হলে প্রতিটি মুসলমানের উচিত তার অন্তরকে শিরকমুক্ত করা এবং তার আত্মীয়-স্বজন, ভাইবোন, প্রতিবেশী কিংবা যে কারও প্রতি অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ বা অমঙ্গল কামনা থাকলে তা থেকে অন্তরকে মুক্ত করা। সেই ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করে আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করা। সব ধরনের শিরক ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হোক আমাদের অন্তর। আল্লাহ যেন আমাদেরও ক্ষমার চাদরে আবৃত করে নেন।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: লাইফস্টাইল

Leave A Reply

Your email address will not be published.