মঙ্গলবার ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ২০ নভেম্বর, ২০১৮ মঙ্গলবার

ঘামে নয় শ্রমিকের রক্তে কেনা মে দিবস

রনজিৎ মোদক : সভ্যতার রূপায়ন ঘটেছে শ্রমিকের হাতুড়ির আঘাতে আঘাতে। শ্রম দিয়েই দুনিয়ার অগ্রযাত্রা। শ্রমেই সৃষ্টি। অথচ শ্রমিক তার অধিকার হারা সভ্যতার শুরু থেকেই। ইটের ওপর ইট গেঁথে আকাশচুম্বী প্রাসাদে বসে যখন মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন বোনা হয় ঠিক তখনও শ্রমিকেরা অধিকার আদায়ে বুকের রক্ত ঝরায়। বঞ্চিত খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদের অধিকার আদায়ের ইতিহাস ১৩০ বছর পেরুল। আজ ১ মে। মহান মে দিবস। “কর্মের যুগ এসেছে সবাই কাজে লেগে গেছে, আমরা কি হবো অবসান?” চারণ কবি মুকুন্দ দাসের এই কথাকে সামনে রেখে দেশের উন্নয়নের কাজে এগিয়ে যাওয়ার এই আজকের মে দিবসের প্রতিশ্রুতি।

হাজার বছরের বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিন বুকের রক্ত ঝরিয়েছিলেন শ্রমিকেরা। শ্রম ঘণ্টা কমিয়ে আনার দাবিতে এদিন শ্রমিকরা যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। সে ডাকে শিকাগো শহরের তিন লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ বন্ধ রাখেন। শ্রমিক সমাবেশকে ঘিরে শিকাগো শহরের হে মার্কেট রূপ নেয় লাখো শ্রমিকের বিক্ষোভ সমুদ্রে। এক লাখ ৮৫ হাজার নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে আরো অসংখ্য বিক্ষুব্ধ শ্রমিক লাল ঝান্ডা হাতে সমবেত হন সেখানে। বিক্ষোভ চলাকালে এক পর্যায়ে পুলিশ শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে ১১ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।

এদিকে হে মার্কেটের ওই শ্রমিক অসন্তোষের আগুন জ্বলে উঠে গোটা দুনিয়ায়। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। অবশেষে তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্র সরকার। পরে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর রক্তঝরা অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ওই ঘটনার স্মারক হিসেবে ১ মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করতে শুরু করে।

রক্ত দিয়ে কেনা শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার এদিনটিকে বাংলাদেশও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়। ব্রিটিশ আমল তথা ১৯৩৮ সালে নারায়ণগঞ্জে প্রথম মে দিবস পালিত হয়। তারপর পাকিস্তান আমলেও মে দিবস যথাযথ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে পালিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসন থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে বিপুল উদ্দীপনা নিয়ে মে দিবস পালিত হয়। ওই বছর সদ্য স্বাধীন দেশে ১ মে সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা, শ্রমজীবী মানুষসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শ্রমিকদের যথাযথ সম্মান জানিয়ে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব তফসিলি ব্যাংক ও কলকারখানা বন্ধ থাকবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও বেতারগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা কর্মসূচি পালন করবে দিনটিতে।

 

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।
ইমেইল : ranjitmodakpress@gmail.com

Categories: খোলা বাতায়ন,নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.