শনিবার ৭ আশ্বিন, ১৪২৫ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শনিবার

রহমত ও ফজিলতপূর্ণ শবেবরাত

  • সৈয়্যদ নূরে আখতার হোসাইন আহমদী নূরী

আল্লাহর প্রিয় হাবিব রাসুলুল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.) ১৫ শাবানের রাতকে লাইলাতুন-নিসফে মিন শাবান বলে ঘোষণা করেছেন। এ রাতের সপক্ষে কোরআন-হাদিসে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ রয়েছে। এ রাতটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এবং সাব্যস্ত। শবেবরাতের ফজিলতের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদিন, ওলামায়ে দ্বীন, পীর-বুজুর্গ, আলেম-ওলামা, সালফে সালেহিন ও মুহদ্দিসিনে কিরামরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন এবং নিজেরা পালন করে আসছেন। এ রাতের বিশেষ ইবাদত এবং দিনের রোজা পালনের ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে। এটি চৌদ্দশ বছরের পুরানো ঐতিহ্য।
পবিত্র কোরআনে সূরা ‘দুখানে’ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রাতে কিতাব নাজিল করেছি। এই রাতটিতে প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়। এ আয়াতে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ বা বরকতময় রাতটির সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ না থাকায় সাহাবারা দু-রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অনেক সাহাবা লাইলাতুল বরাতের কথা বলেছেন। তাদের অন্যতম হজরত আবু হুরায়রা (রা.), হজরত ইকরামাহ (রা.), হজরত আয়েশা (রা.), শেরে খোদা হজরত আলী (রা.), হজরত আবু সালাবা (রা.), হজরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) প্রমুখ। কয়েকজন সাহাবা শবেকদরকেও বুঝিয়েছেন। তবে পবিত্র কোরআনের ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্বখ্যাত ২৭টি তাফসির গ্রন্থে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ বলতে শবেকদরকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও শবেবরাতের সম্ভাব্যতাও বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ শবেবরাতকে অস্বীকার করা হয়নি। এসব তাফসির গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য হলো তাফসিরে কুরতবি, তাফসিরে কাশশাফ, তাফসিরে কবির, তাফসিরে রুহুল মা’আনি, তাফসিরে দুররে মানসুর, তাফসিরে রুহুল বয়ান, তাফসিরে বাইযাবি, তাফসিরে বাগাবি প্রভৃতি। এসব নামকরা তাফসির গ্রন্থে শবেবরাতের একাধিক নাম এবং ফজিলত সম্পর্কে আলোকপাতের মাধ্যমে সূরা দুখানের বরকতময় রাতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বহু হাদিসগ্রন্থে শবেবরাতের তাৎপর্য ও ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। সুনানে তিরমিজি, সুনানে ইবনে মাজাহ, সহি ইবনে হিব্বান, সুনানে বায়হাকি, মু’জামুত তাবারানি, দাইলামি, কানযুল উম্মাল, মুসান্নাফে বাযযার, মুসনাদে আহমদ, মুসনাদে ইসহাক, শারহুস সুন্নাহসহ অনেক হাদিসগ্রন্থে শবেবরাতের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে, যা অকাট্য দলিল হিসেবে মুসলিম জাহানে সর্বজনগ্রাহ্য ও অনুসরণীয় হয়ে আসছে।
সিহাহ সিত্তার অন্তর্ভুক্ত ইবনে মাজাহতে ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.) ‘শাবানের ১৫ তারিখ রাতের বয়ান প্রসঙ্গ’ শিরোনামে একটি অধ্যায় বর্ণনা করেছেন। (অধ্যায় : ১৯১, হাদিস : ১৩৮৮-১৩৯০)। সেখানে তিনি হজরত আলী (রা.) এর বরাতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন শাবানের ১৫ তারিখ আসবে তখন রাতে কিয়াম-ইবাদত বন্দেগি করবে এবং ১৫ তারিখে রোজা রাখবে। হজরত আলী (রা.) এর বরাতে ইবনে মাজাহতে আরও বর্ণিত হয়েছে, যখন লাইলাতুল নিফসে মিন শাবান (শাবানের মধ্যবর্তী রাত) আসবে তখন তোমরা রাতভর ইবাদত করো এবং দিনভর রোজা রাখো। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ কে আছ ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কে আছ অভাবী, আমি তাকে রিজিক দান করব। কে আছ প্রার্থনাকারী? আমি তার প্রার্থনা কবুল করব। এভাবে এ আহ্বান ফজরের উদয় পর্যন্ত চলতে থাকে।
ইমাম তিরমিজি (রহ.) শাবানের ১৪ তারিখের ফজিলত সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। এই অধ্যায়ে তিনি হজরত মা আয়েশা (রা.) এর হাদিস উল্লেখ করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ১৫ শাবানের রাতে আমি রাসুল (সা.) এর বিছানা মোবারকের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, তিনি বিছানায় নেই। সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁকে তালাশ করার জন্য ঘর থেকে বের হই। তাঁকে জান্নাতুল বাকির কবরস্থানে দেখতে পেলাম। তখন রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা এই ১৫ শাবানের রাতে এক বিশেষ রহমত নিয়ে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং বনি কালবের বকরির গায়ে যে পরিমাণে পশম রয়েছে, তার চেয়ে বেশি মানুষকে মাফ করে দেন।
ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.) এবং ইমাম তিরমিজি (রহ.) শুধু এ হাদিসগুলো বর্ণনা করেননি; বরং তাঁরা গ্রন্থে স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেনÑ যাতে প্রতিফলিত হয়েছে শবেবরাতের বিষয়ে বৈধতা এবং তাঁদের আকিদাও ছিল যে, এ মহান রাতটি ইবাদতের রাত। তাঁরা এ রাতের গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ইবাদত বন্দেগি করেছেন। সিহাহ সিত্তার এসব জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস শবেবরাতের বর্ণনা করেছেন; সুতরাং তাঁদের বর্ণনাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
হজরত মা আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.) কে শবেবরাতের রাতে আসমানের দিকে মাথা উত্তোলন করে দোয়া করতে দেখেছিলেন। এ হাদিসটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। মা আয়েশা (রা.), হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হজরত আলী (রা.) ছাড়াও অনেক সাহাবা হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হজরত ইবনে মাজাহ (রহ.) হজরত আবু মুসা আল-আশআরী (রা.) থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এভাবে, নবী (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ১৫ শাবান রাতে প্রকাশ করেন অনুগ্রহ ও মাগফেরাত এবং সব মাখলুখকে ক্ষমার ব্যবস্থা করেন। এই হাদিসটি সহি ইবনে হিব্বানে হজরত মু’আয ইবন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপভাবে হজরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) তাঁর মুসনাদে হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে হাদিসটি রেওয়ায়েত করেছেন। ইমাম বায়হাকিও (রহ.) হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
হানাফি মতের অনুসারী হজরত আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলভি (রহ.) ‘মা সাবাতা বিস সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসগুলো বর্ণনার পর কয়েকজন তাবেঈর বাণী ও তাঁদের আমলগুলো উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, আমাদের কাছে এই মর্মে হাদিস পৌঁছেছে যে, ৫টি রাতে দোয়া কবুল হয়Ñ ১. জুমার রাতে, ২. ঈদুল আজহার রাতে, ৩. ঈদুল ফিতরের রাতে, ৪. রজবের প্রথম রাতে ও ৫. পনেরো শাবানের রাতে (শবেবরাতের রাত)। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, আশুরার রাত, পহেলা রজবের রাত এবং শাবানের ১৫তম রাতে নফল ইবাদত করা মুস্তাহাব। ইমাম মালেক (রহ.) ‘মাদখাল’ গ্রন্থে নিজের আমল সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি বলেন, এ রাত অত্যধিক সম্মানিত ও বরকতময়। সালাফে সালেহিন এ রাতটিকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং এ রাত আগমনের আগেই তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন।

বিশেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/ইলিয়াছ

Categories: লাইফস্টাইল

Leave A Reply

Your email address will not be published.