বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

হকার ইস্যুতে ফের শহর অশান্ত করার চেষ্টা

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: বঙ্গবন্ধু সড়ক নগরীর ব্যস্ততম একটি সড়ক৷ প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ক্লিনিক, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান৷ তাই প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত হয় এই সড়কে৷ সড়কের পাশে ফুটপাত রাখা হয় পথচারীদের পায়ে হেঁটে চলাচল করার জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতগুলো ছিল হকারদের দখলে৷ যার ফলে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে ভোগান্তি পোহাতে হতো সাধারণ মানুষদের৷ সাধারণ মানুষকে এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতেই নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে হকার বসতে নিষেধ করেছিলেন৷ কিন্তু বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসাকে কেন্দ্র করে ঘটে গেছে সংঘর্ষ-সংঘাতের মতো ঘটনা৷ আহত হয়েছে মেয়রসহ শতাধিক মানুষ৷

সেইসময় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় বিকাল পাচঁটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়ক ছাড়া শহরের যেকোনো সড়কে হকার বসতে পারবে।

খোজ নিয়ে দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন সড়কে হকাররা বসে৷ বঙ্গবন্ধু সড়ক ছাড়া প্রেসিডেন্ট রোড গলি, নবাব সলিমউল্লাহ রোড, চেম্বার রোড, নয়ামাটি রোড, শায়েস্তা খান রোড, নবাব সিরাজউদ্দোল্লা রোড, পানোরামা প্লাজার সামনের গলি, প্রেস ক্লাবের সামনের গলিতে হকাররা বসছে৷ এসব স্থানে হকারদের বসতে কোন নিষেধ নেই৷ এছাড়াও হকারদের জন্য নির্মিত হকার্স মার্কেটেও হকাররা বসছে৷

কিন্তু রবিবার (২২ এপ্রিল) সকালে হকার্স সংগ্রাম পরিষদ শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে বিবি রোডে হকার বসার হুশিয়ারী দিচ্ছে৷ যেখানে হকার্স নেতারা কড়া হুশিয়ারী দিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন যে, আগামী ১লা মে, বিশ্ব মে দিবস এর আগে যদি বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে উচ্ছদকৃত হকারদের পূনর্বাসন না করা হয় তাহলে তারা কঠোর আন্দোলনে লিপ্ত হবে৷ মশাল মিছিল, লাঠি মিছিল এমনকি ঘেরাও করারও ঘোষণা দিয়েছেন৷
হকার্স নেতাদের দেয়া আজকের এমন ঘোষণা সাধারণদের শঙ্কিত করে তুলেছে৷ কেন হকাররা বঙ্গবন্ধু সড়কে বসার জন্য এত উৎসুক? বঙ্গবন্ধু সড়কে বসতে চাইবার কারন কি? এতো সংঘাত-সংঘর্ষের পরেও কেন বঙ্গবন্ধু সড়কে বসতে চাওয়া? জনমনে এখন এরকম প্রশ্ন দেখা দিয়েছে৷
রাজনীতি বিশ্লেষকদের দাবি, বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসা নিয়ে আন্দোলন নিছক কোন আন্দোলন নয়, এটা রাজনৈতিক কোন চাল৷ হকারদের পেছন থেকে অন্য কেউ এই আন্দোলনের কলকাঠি নাড়ছেন৷
হকারদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিবি রোডের এই অবৈধ ফুটপাত বাণিজ্যের পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রশাসন, সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও এক শ্রেণির অসাধু সাংবাদিকের সমন্বয়ে গড়া এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে বিবি রোডের বিশাল ফুটপাত বাণিজ্যের পুরোটা। এদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ নগরবাসী।

জানা যায়, জায়গার গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে ব্যবসা করতে হয় হকারদের। এই হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকার অদৃশ্য চাঁদাবাজি হয় বিবি রোডের এই ফুটপাতকে ঘিরে।
বিবি রোডে চলাচলকারি এক পথচারী আক্ষেপের সুরে বলেন, বিবি রোডের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পর নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের চাওয়া পূরন হয়েছিলো। নারায়ণগঞ্জে স্মরণকালের সর্ববৃহত এ উচ্ছেদের পর সাধারণ মানুষ ভেবেছিলো, এবার আর অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। ইতিপূর্বে বহুবার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ হলেও কিছুদিন পর তা আবার দখল হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এবার পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা দেখে মনে হয়েছিলো, এবার আর বুঝি ফুটপাত হকারদের অবৈধ দখলে যাবে না। নারায়ণগঞ্জের মানুষ নিশ্চিন্তে ফুটপাত দিয়ে চলাফেরা করতে পারবে। কিন্তু হঠাৎ করে হকারদের কারা উস্কানি দিচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে বলেন এই পথচারী।

নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, তিনি হকার উচ্ছেদের পক্ষপাতি নন৷ তিনি কেবল বঙ্গবন্ধু সড়কে জনগণের ভোগান্তি চান না৷ বঙ্গবন্ধু সড়ক ছাড়া বাকি সড়কগুলোতে হকার বসতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই৷ কিন্তু বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসা যাবে না৷

গত ৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সাংবাদিকদের এক কর্মশালার সমাপনী দিনে এক বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসা নিয়ে তিনি বলেন, আমি কখনোই নারায়ণগঞ্জ থেকে হকার উচ্ছেদ করতে চাই নাই৷ হকারদের জন্য বিশাল মার্কেট করে দিয়েছি তা সকলেই জানেন৷ ছয়শো হকার সেখানে বসিয়েছি৷ এছাড়া নয়ামাটি রোডে তিনশো, চেম্বার রোডে সাড়ে তিনশো, শায়েস্তা খান রোডে আড়াইশো, পপুলারের সামনে এক থেকে দেড়শো, পানোরামা প্লাজার গলিতে দুইশো হকার বসে৷ আমি তো হকারদের বসতে না করি নি৷ কেবল বলেছি বঙ্গবন্ধু রোডে হকার বসতে পারবে না৷ এতে যানজট হয়, মানুষের হাটতে সমস্যা হয়৷
এই হকার আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই আবার সংঘর্ষ হবার সম্ভবনা রয়েছে বলে মনে করেন শহরবাসী৷ পাশাপাশি শান্ত নারায়ণগঞ্জ কে কারা পুনরায় আশান্ত করার চেষ্টা করছে তাদের চিহ্নিত করার দাবি উঠছে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, আমি মনে করি যে, মেয়র বিরধী লোকেরাই এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লাভবান হচ্ছেন। সাধারণ মানুষদের যদি প্রশ্ন করেন তবে প্রায় সকলেই বলবে আমরা ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে চাই। সুতরাং এখানে অন্য কিছু ভাবার প্রশ্নই আসছে না। আবার অন্যদিকে শুধুমাত্র বিবি রোড ব্যতিত সকল সড়কই হকারদের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, সেখানে তারা চাইলেই বসতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্য দেশের সবখানেই হকার আছে তবে কোথাও হকাররা ফুটপাতে সড়ক দখল করে বসে থাকে না। বরং সবখানেই তাঁদের জন্যে নির্দিষ্ট স্থান করে দেয়া আছে। তাই আমি মনে করি যে এটা ওসমান পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়র বিরোধী মনোভাব নিয়ে করা হচ্ছে। এছাড়া আমি কিছু দেখছিনা।
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, বঙ্গবন্ধু সড়কে না বসলেও যে হকাররা চলতে পারে সেই সত্যটা ইতমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তারা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সড়কে বসে না তবে বঙ্গবন্ধু সড়কের আশেপাশে যে সকল সড়কগুলো আছে সেখানে নিয়মিতই বসছে আর এতে একদিকে মানুষের দুর্ভোগটাও কমেছে অন্যদিকে সেখানে ক্রেতদের আনাগোনাও কম নয়। তবে এখন তারা আন্দোলনে নামতে চাইলে এবারের আন্দোলন অন্য কেউ নয় জনগণ প্রতিহত করবে। এ মুহূর্তে ঈদকে কেন্দ্র করে যারা আবার মাঠে নামছে তারা হকার নয়। অন্যান্য সময়ে যেখানে বিভিন্ন মহল হকারদের কাছ থেকে প্রতি মাসে সোয়া কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে সেখানে এই অকেশনাল মাসে এই চাঁদার পরিমান গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা। আর এ কারণেই এই চাঁদাবাজ ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের ইন্ধনে বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসাকে কেন্দ্র করে আবারো নারায়ণগঞ্জে হট্টগোল বাধাঁনোর চেষ্টা চলছে।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: নারায়ণগঞ্জের খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.