বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

সাংবাদিকদের ঐক্য এখন সময়ের দাবি

শামীম শিকদার: বিভিন্ন ঘটনাবলি, বিষয়, ধারণা ও মানুষসম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন, যা ওই দিনের প্রধান সংবাদ এবং তা সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। এ পেশায় শব্দটি দিয়ে তথ্য সংগ্রহের কৌশল ও সাহিত্যিক উপায় অবলম্বনই সাংবাদিকতা। সাংবাদিক হচ্ছে জাতির বিবেক। কিন্তু সেই সাংবাদিকদের আজ লাঞ্ছিত করা হয়। নির্যাতনের স্বীকার হতে হয় পথে পথে। গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজব্যবস্থায় সাংবাদিকতা অতটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়; কিন্তু আমাদের দেশের পুরো সমাজব্যবস্থাই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি কোনো নীতিনৈতিকতা বা আদর্শের ভিত্তিতে নয়, এটা মূলত অন্ধ রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন। পেশাজীবীরাও আজ বিভক্ত। সাংবাদিকতাও এ বিভক্তির হাত থেকে বাঁচতে পারেনি, যা দুর্ভাগ্যজনক। পেশায় অনৈক্য, সাংবাদিকতা আর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ তথা রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলা, মিডিয়া মালিকানার আপন ব্যবসায়ীকে স্বার্থের মতো কারণগুলোও সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজ আমাদের সাংবাদিকরা দলীয় পরিচয়ে পরিচিতি বহন করেন! কেউ আওয়ামীপন্থি, কেউ বিএনপিপন্থি, কেউ জামায়াতপন্থি, কেউ জাতীয় পার্টিপন্থি আবার কেউ-বা কমিউনিস্টপন্থি সাংবাদিক। এই দলীয় সাংবাদিকতাও সাংবাদিকদের পেশা ও জীবনের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তবে সবাই যে দলীয় সাংবাদিকতা করছেন এমনটা নয়, ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। কিন্তু ব্যতিক্রম উদাহরণ নয়। সত্য কখনো বিপজ্জনক হতে পারে না। আমরা এই দর্শনেই বিশ্বাস করি। মনে করি, সত্যান্বেষণই সাংবাদিকতার মহান ব্রত। প্রত্যেক সাংবাদিকই মানবাধিকার কর্মী এটাও আমাদের বিশ্বাস। একজন মানবাধিকার কর্মী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তথ্যানুসন্ধান করে রিপোর্ট প্রণয়ন করেন। ঠিক একইভাবে একজন সাংবাদিককেও ঘটনার পেছনে ঘটা সত্যটাকে খুঁজে অনুসন্ধান করে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- তথা মানবাধিকার লঙ্ঘন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু-আদিবাসী নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি-জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট নির্মাণই সাংবাদিকতার অংশ।

২০১৭ সালে দেশে ৬৫ সাংবাদিক হতাহত হয়েছেন, ৯০ সাংবাদিককে হত্যার হুমকি, ১৯ জনকে গ্রেফতার, নানা আইনে ১৪ জনকে হয়রানি এবং ৫ জনকে অপহরণ কর হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন জাতির বিবেক বলে পরিচিত সাংবাদিক সমাজ। বস্তুনিষ্ঠ সত্য সংবাদ প্রকাশ হলেই তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। যেটা কোনো সভ্য দেশের মানুষ আশা করে না। বিগত দিনে আমাদের দেশে যারা সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের বিচার না হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অপরাধীরা একজোট হয়ে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হচ্ছে। অপরাধী চক্রের মতো যেন পিছিয়ে নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দায়িত্ব যাদের হাতে সেই পুলিশই এখন একের পর এক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রতি দেশের পুলিশকে জনবান্ধব হওয়ার জন্য বললেও তা মানা হচ্ছে না।

বর্তমানে সাংবাদিকদের মধ্যে একতার অভাব। সবাই ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে চিন্তা না করে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য কাজ করতে হবে

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সংবাদ প্রকাশের জেরে বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি নাজমুল হুদাকে একাধিক মামলা দিয়ে জেলে পাঠায় পুলিশ। তাকে শারীরিকভাবেও নির্যাতন করার অভিযোগ ওঠে। পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাটে নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যমুনা টিভির রিপোর্টার শাকিল হাসান ও ক্যামেরাপারসন শাহীন আলমকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। দৈনিক জনতার প্রধান প্রতিবেদক মশিউর রহমান রুবেলকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও কুপিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সৌদি আরবে হজ কাফেলায় যাওয়া দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার ওবায়দুল্লাহ বাদলকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ডেমরার বাঁশেরপুল এলাকায় বিজয় টিভির সিনিয়র রিপোর্টার কামরুজ্জামানকে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা চালায় সন্ত্রাসীরা। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে এনটিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইমরুল আহসানকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে সন্ত্রাসীরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে সাংবাদিক সুহাস চক্রবর্তীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং টকশোতে সরকারের সমালোচনার স্বাধীনতার অবস্থা সামরিক শাসনের চেয়েও খারাপ। এসবের প্রতিবাদ হচ্ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্যাতনের মাত্রা। শুধু সংবাদকর্মী নির্যাতন নয়, বিভিন্ন পত্রিকার অফিসে হামলার ঘটনাও অহরহ ঘটছে।

২০১৬ সালে ১১৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সাংবাদিক হত্যার বিচার এবং হয়রানি-নির্যাতনের ঘটনার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ না হওয়ায় এসব ঘটনা বেড়ে গেছে। দ্বিধাবিভক্তি দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে না পারলে এসব ঘটনা প্রতিরোধ করা যাবে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের পাশাপাশি একটি কার্যকর সুরক্ষা কৌশল ও নীতিমালাও জরুরি। বিচারহীনতার কারণে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশ, সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা নির্যাতন এবং হয়রানি করছে। হত্যাকাণ্ডসহ সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার সঠিক বিচার হলে এসব ঘটনা মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছাত না। দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের নির্যাতনে পুলিশের ভেতরে পেশাদারিত্বের অভাব দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশের শৃঙ্খলাও ভেঙে গেছে। তারা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অপরাধের কথা তুলে ধরায় এখন সাংবাদিকদের নির্যাতন করছে। মিথ্যা মামলায় হয়রানি করছে। রাজনৈতিক নেতা ও অপরাধীদের পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের নির্যাতন ও হয়রানি করা হচ্ছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো ও সাংবাদিক নেতাদের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার জোরালো কোনো প্রতিবাদ ও পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় দিন দিন নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। অনেক সময় সাংবাদিক নেতারাও এসব ঘটনার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিবাদ করছেন না। প্রতিবাদ করলে ভিন্নমতের সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন এ আশঙ্কায় অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক নেতারাও গণমাধ্যমে মন্তব্য করতেও বিব্রতবোধ করছেন।

অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা, ধর্ম অবমাননা, মানহানির মতো সাইবার অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে সাজার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল ও নিরাপত্তা এজেন্সি গঠনের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া ৩২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। কেউ যদি এই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। ধারাগুলো সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, যার মধ্যে ৩২ ধারা হচ্ছে অন্যতম একটি ধারা।

সাংবাদিকরা যাতে স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমন এ দেশের উন্নয়ন চায়, তেমনি এ দেশের সাংবাদিক সমাজও। সাংবাদিকরা দেশের বাইরে নয়। তাহলে সবার মতো সাংবাদিকদেরও নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। যারা সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে ধারণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে, তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব আছে এটা কর্মরত সাংবাদিকদের শিকার করতে হবে। হয়তো প্রতিবাদের সময় মানববন্ধন বা সভা-সমাবেশে একসঙ্গে দাঁড়াচ্ছে কিন্তু মনস্তাত্তিকভাবে অনেকেই আন্তরিক নয়। পেশার প্রতি ভালোবাসা না কোনো রকম জীবিকা নির্বাহ যেন তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। কটি মানববন্ধন করে কখনো এ ধরনের ঘটনাকে শেষ ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না। বর্তমানে সাংবাদিকদের মধ্যে একতার অভাব। সবাই ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে চিন্তা না করে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য কাজ করতে হবে। সব শেষে ঐক্য ছাড়া সাংবাদিক সমাজের কোনো বিকল্প নেই। সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য না হলে এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: খোলা বাতায়ন,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.