বুধবার ৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ২১ নভেম্বর, ২০১৮ বুধবার

প্রতিনিয়তই যানজট বাড়ছেই, দেখার কেউ নেই

হাসান ইমন: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা ও গোমতী সেতুর টোলপ্লাজা এখন বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুই সেতুর টোলপ্লাজায় টোল আদায়কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট যানজট যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে যানজট। ভোগান্তির মাত্রাও বাড়ছে যাত্রীদের। এ নিয়ে প্রতিদিনই লেখালেখি হচ্ছে গণমাধ্যমে। অভিযোগ যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু কিছুতেই টনক নড়ছে না সেতু কর্তৃপক্ষের। বরং টোলপ্লাজার টোল আদায়ে ধীরগতি ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে যানজট বাড়ছেই।

দীর্ঘদিন এই পথে চলাচলকারী ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, এই দুই সেতুতে অতিরিক্ত ওজনবাহী গাড়ি নিয়ন্ত্রণে স্কেল বসিয়ে টাকা আদায়ের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে প্রতিদিনই অ্যাম্বুলেন্সসহ হাজারো যাত্রী ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এছাড়া টোল আদায়কারী কর্তৃপক্ষের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট, পুলিশের গাফিলতি, ফিটনেসবিহীন যানসহ নানা কারণে সব দুর্ভোগের ঠিকানা টোলপ্লাজা।

জানা গেছে, যানজটমুক্ত নির্বিঘ্ন চলাচলে দুই লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয় ২০১৬ সালের ১ জুলাই। আশা করা হয়েছিল যানজট কমবে। কিন্তু ঘটেছে উল্টোটা। চার লেনে উন্নীত হওয়ার কারণে যে সুফল পাওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। বরং টোল আদায়ে অব্যবস্থাপনার কারণে এই সড়ক এখন যাত্রীদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই দুই সেতুতে যানজট হচ্ছে। বিশেষ করে বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার যানজটের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যানজটে আটকা পড়ছে হাজার হাজার পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহন। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, দ্বিতীয় মেঘনা, মেঘনা-গোমতী ও কাঁচপুর সেতুর কাজ চলায় প্রায়শই সে পথ দিয়ে যানবাহন ধীর গতিতে চলে। ফলে এ পথে যানজট আগের চেয়ে বেড়েছে। দাউদকান্দি গোমতী ও মেঘনা সেতুর টোলপ্লাজায় টোল আদায়ে ধীরগতি, মালবাহী ট্রাক-লরি থেকে টোল আদায়ের সময় অতিরিক্ত ওজনের নামে চাঁদা আদায়, এসব পরিবহনের চালক-হেলপারের সঙ্গে টোল কর্তৃপক্ষের কথা কাটাকাটির ফলেই মহাসড়কজুড়ে এ দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়ে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় সরজমিনে গেলে দুই সেতুতে দীর্ঘ যানজট চোখে পড়ে। হাজার হাজার যাত্রীর সঙ্গে যানজটে আটকে ছিলেন স্টারলাইন বাসের চালক রমিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘চার লেন মহাসড়ক ধরে চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা বিশ্বরোড, ময়নামতি, চান্দিনা পার হয়ে সাঁ সাঁ গতিতে আসা কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু দাউদকান্দি ব্রিজের কাছাকাছি আসলেই গাড়ির চাক্কা থাইমা যায়। এই কয় ফুট আগানোর পরে আবার থামতে হয়। এভাবে এক ফুট, দুই ফুট করে ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে কয়েক বার স্টার্টও বন্ধ করতে হয়। এর মধ্যে যাত্রীদের কি অবস্থা হয় তা বুইঝা লন।’

চট্টগ্রাম থেকে প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় আসেন যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা শওকত আলী। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বা ঢাকা থেকে বাসে উঠলেই যাত্রীরা সবাই মেঘনা ও দাউদকান্দি ব্রিজ আতঙ্কে ভোগেন। ব্রিজ পার হলে আর তেমন কোনো চিন্তা নাই। কিন্তু ব্রিজের টোলপ্লাজায় কতক্ষণ লাগবে তা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। ওই যাত্রী বলেন, যেদিন টোলপ্লাজার সবগুলো বুথ খোলা থাকে, পুলিশ ঠিকমতো ডিউটি করে, সেদিন খুব বেশি ঝামেলা হয় না। আধা ঘণ্টা বা পৌনে এক ঘণ্টা পর গাড়ি আবার মহাসড়কে ওঠে। আর মহাসড়কে ওঠা মানেই গন্তব্য বেশি দূরে নয়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের শ্যামলী পরিবহনের চালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, দুই সেতুর টোল প্লাজার চরম অব্যবস্থাপনায় দুপাশে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে যাত্রীবাহী পরিবহনসহ যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। আর এতে যেমন সাধারণ যাত্রীরা পড়ছেন ভোগান্তিতে, তেমনি সরকারের চার লেন প্রকল্পও জনগণের কাছে বিফল মনে হচ্ছে।

ট্রাকচালক সৌখিন বলেন, ট্রাক, লরি বা কাভার্ড ভ্যান টোল প্লাজায় ওজন করতে গিয়ে তর্কাতর্কি হয়, তার জেরে দীর্ঘ যানজট হয়। তিনি বলেন, প্রথমে কোনো লরি ওজন করার স্কেলে দেওয়া হলে ওজন দেখায় ২০ টন, কিন্তু ড্রাইভার বলে, আমি তো আনলাম ১৫ টন। তখন তারা বলে, পেছনে গিয়ে আবার আসেন। আবার স্কেলে ওঠানো হলে হয়তো একটু কমে হয় ১৮ টন, কিন্তু ড্রাইভার তা মানে না। সে বাড়তি ফি দেবে না বলে গোঁ ধরে। এবার তাকে গাড়ি সাইড করে রাখতে বলা হয়। এমন করতে করতে ওই গাড়ির পেছনে লেগে যায় দীর্ঘ লাইন।

এই পথে যাতায়াত করেন কুমিল্লা-১ আসনের (দাউদকান্দি) আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভূইয়া। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজটের অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই যানজট লেগে আছে। বিশেষ করে মেঘনা-গোমতী সেতুকে ঘিরে যানজট শুরু হয়। এতে দিন দিন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির আকার বাড়ছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই সংসদ সদস্য জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ও সড়ক বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে এ নিয়ে একাধিকবার কথা বলেছেন। সমস্যাগুলো তাদের সামনে তুলে ধরেছেন। মন্ত্রী অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যানজট নিরসনের।

এই মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম প্রায়ই যাতায়াত করেন ফেবিটেক্স ফেবিয়ান গ্রুপের ম্যানেজার মাসুমুল হক সুমন। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হলো চার লেনের। আর সেতু হচ্ছে দুই লেনের। এ চার লেনের পরিবহনগুলো যখন দুই লেনে আসে তখনই যানজট সৃষ্টি হয়। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এই মহাসড়ক দিয়ে মাল বোঝাই বড় ট্রাক ও লরি যাতায়াত করে। এই পরিবহনগুলো সাধারণত অন্য পরিবহনের তুলনায় ধীরে চলে। এতে করে যখন গাড়িগুলো সেতুতে উঠে তখন পাশে আর জায়গা থাকে না। ফলে লরির পেছনে গাড়ির দীর্ঘ সাড়ি সৃষ্টি হয়। এছাড়া রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে পুলিশের হয়রানি এই যানজটের অন্যতম কারণ। টোলপ্লাজার টোল আদায়ের দায়িত্বে যারা, তাদের অবহেলাও যানজটের আরেকটি কারণ।

গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন ২০০ গাড়ি রাস্তায় নামছে, মাসে ছয় হাজার। চট্টগ্রামেও গাড়ি বাড়ছে। সেই গাড়ি মহাসড়কে আসছে। দেড় বছর আগে চার লেন হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কিন্তু বাড়তি গাড়ি থমকে যাচ্ছে দুই লেনের সেতুতে এসে। সেখান থেকেই যানজটের শুরু। ব্রিজ থেকে নেমে গাড়ির ড্রাইভাররাও প্রতিযোগিতা করে কে কার আগে যাবে। এ জন্য ছোট গাড়ি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মহাসড়কের দুই পাশের হাটবাজারগুলো সরিয়ে দিতে হবে দ্রুত। হাইওয়ে পুলিশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আরো কার্যকরভাবে সড়কে রাখতে হবে। উল্টো দিকের যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। এছাড়া অটোরিকশা, ঠেলা, রিকশা, নসিমন চলাচল বন্ধ করতে হবে অথবা তাদের জন্য পৃথক লেন করে দিতে হবে। টোলপ্লাজার আধুনিকায়ন করতে হবে। কারণ পণ্যবাহী যানের টোল আদায়ে অনেক সময় চলে যায়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক-মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, সমস্যা সমাধানে কমিটি করা হয়েছে। কমিটি আলোচনা পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দেবে। পরে প্রতিবেদনের আলোকে সমস্যার সমাধান খোঁজা হবে।

গত বৃহস্পতিবার সরজমিনে ঘুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজট দেখা গেছে। একই সময় ঢাকা থেকে কুমিল্লা-চট্টগ্রামগামী অনেকেই মেঘনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যানজটে আটকে ছিলেন। অনেকে কুমিল্লা থেকে সকাল ৭টায় যাত্রা করে ১০টায় মেঘনা-গোমতী সেতু পর্যন্ত পৌঁছান। যানজটে আটকে থাকা যাত্রীরা জানান, এ চিত্র নিত্যদিনের, সব সময়ের। মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করলেও টোল বক্সের কারণে এখানকার যানজট থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছেন না যাত্রীরা। টোল আদায়কারীদের অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে সেখানে নিত্যদিনের যানজট লেগেই থাকে।

এ বিষয়ে টোল আদায়কারী সিএনএস কোম্পানি লিমিটেডের সহকারী ম্যানেজার শওকত আলী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনের। কিন্তু মেঘনা-গোমতী ও মেঘনা সেতু দুই লেনের। এতে চার লেনের মহাসড়কে যে গতিতে ও যে পরিমাণ যান চলে, স্বাভাবিকভাবেই সেতুর টোলপ্লাজার সামনে এসে সেগুলোর গতি কমে যায়। এছাড়া টোল আদায়ে ধীরগতির কারণে একটি যান টোল দিয়ে সেতুতে উঠতে উঠতে পেছনে লম্বা সারির সৃষ্টি হয়। ক্রমে এই সারি দীর্ঘ হতে হতে তীব্র যানজট তৈরি করে।

হাইওয়ে পুলিশের দাউদকান্দি থানা পুলিশের ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, বৃহস্পতি ও শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় যানবাহনের চাপ এমনিতেই বেশি। এছাড়াও দাউদকান্দি ও মেঘনা সেতুতে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং টোলপ্লাজায় ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেলে ধীরগতির কারণে কিছু যানজট আছে। তবে যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।

নিউজ২৪ ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: জাতীয়,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.