শনিবার ৭ আশ্বিন, ১৪২৫ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শনিবার

সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী আ.লীগ আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: আগামী ২০১৯ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেনীতে যার যার মতো কাজ করে যাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। ফেনীর ৩টি আসনের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো সদর আসন। ফেনী পৌরসভা ও সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে ফেনী-২ সদর আসন গঠিত। অতীতে এ আসনে যারা এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তারা জেলার নিয়ন্ত্রক হিসেবে ছিলেন। জেলা সংগঠনের মূল ভূমিকায়ও তাদের দেখা গেছে। অনেকে আবার ক্ষমতা পেয়ে গডফাদার খ্যাতিও পেয়েছেন। ফেনীর ৩টি সংসদীয় আসনের মধ্যে এ আসন নানাভাবে আলোচিত হয়েছে এবং পরিচিতি পেয়েছে। এদিকে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে রাজনীতির মাঠ তত গরম হচ্ছে। ফেনীতেমামলা-হামলায় জর্জরিত বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পুলিশি বাধা ও অন্তর্কোন্দলে কিছুটা ছন্দ হারালেও থেমে নেই। বিএনপি নেতাকর্মীরা আলাদা আলাদা গ্রুপে বিভক্ত হলেও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নেত্রীকে প্রাধান্য দেন। ফলে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা আগামী নির্বাচনে জেলা সংগঠন গোছানোর কাজে মনোযোগ দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার নেতৃত্বে নির্বাচন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নেতাকর্মীরা। অপরদিকে আ.লীগ নেতাকর্মীরা অনেকটা খোশ মেজাজে রয়েছে। দল ক্ষমতায় থাকায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে জেলার হাইকমান্ডের প্রতি নেতাকর্মীরা অনুগত রয়েছে। প্রশাসন আ.লীগের সমর্থনে থাকায় আগামী নির্বাচন নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই এ দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের। এছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে মামলা-হামলা আর কোন্দলে জর্জরিত বিএনপি মাঠে দাঁড়াতে পারবে না বলে আ.লীগের বিশ্বাস। ফলে নৌকার টিকিট যিনি পাবেন তার বিজয় সুনিশ্চিত বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।
আওয়ামী লীগ : ফেনী সদর আসনে বর্তমান এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী সর্বজনগ্রাহ্য জননেতা। জেলাজুড়ে তার উন্নয়নের যে ধারা তা অব্যাহত থাকুকÑ এটা চায় দলমত নির্বিশেষে সবাই। ফলে তার মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত তা ধরে নেওয়া যায়। জেলা আ.লীগের প্রবীণ নেতাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি নিজাম হাজারীর মনোনয়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না। তার যে জনপ্রিয়তা তাতে জনগণ মনেপ্রাণে তাকে নির্বাচিত করবে। ফেনীর রাজনীতিতে বর্তমানে নিজাম হাজারী জনপ্রিয় একটি নাম। তরুণ এ রাজনীতিক দলের দুঃসময়ে ফেনী আ.লীগের রাজনীতির হাল ধরেন। তার সুদক্ষ নেতৃত্বের কারণে বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ফেনী জেলা আ.লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো অনেক শক্তিশালী। নিজাম উদ্দীন হাজারীর সুনিপুণ নেতৃত্বে আকৃষ্ট হয়ে ২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর জেলা আ.লীগের সম্মেলনে কেন্দ্র ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা ব্যাপক সমর্থন দিয়ে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। ২০১১ সালে ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে তৎকালীন মেয়র বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আবসারকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে জেলার রাজনীতিতে নিজের অবস্থানের জানান দেন এ নেতা। জেলায় বিএনপির রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে এবং নেতৃত্বে কোন্দল থাকায় গত কয়েক বছরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে ৬ উপজেলা, ৫ পৌরসভা, ৪৪টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং সর্বশেষ জেলা পরিষদের সবকটি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হন। এ কৃতিত্ব নিজাম হাজারীর বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। তাই এবার প্রার্থী বাছাইয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবার ব্যাপারে জানতে চাইলে নিজাম উদ্দিন হাজারী বলেন, বাংলাদেশের সফল প্রধানমন্ত্রীনেত্রী শেখ হাসিনা যাকে যোগ্য মনে করবেন তাকে মনোনয়ন দিবেন। এক্ষেত্রে তিনি দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন বলে নিশ্চিত করেন। জেলা আ.লীগের সিনিয়র নেতারা নিজাম হাজারীর প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেন, এমপি নির্বাচনে বর্তমান এমপির বিকল্প নেই। তার মনোনয়ন না হলে ফেনীতে বিএনপি প্রার্থীকে হারাতে বেগ পেতে হবে। হয়তো আসনটি ২০০৮ সালের মতো হাতছাড়া হয়ে যাবে। এ আসনে ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আ.লীগ থেকে মনোনয়ন পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। কিন্তু ভোটযুদ্ধে বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ইকবাল সোবহান এবারও দলীয় মনোনয়ন লাভের জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। ফেনীর রাজনীতিতে একসময় তার সক্রিয় অবস্থান থাকলেও বর্তমানে জেলা আ.লীগের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে তার মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এরপরও তিনি সময় পেলে ছুটে আসেন নিজ বাড়ি শর্শদি ইউনিয়নের ফতেহপুরে। নির্বাচনি এলাকার মানুষের খোঁজখবর ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি নিজ বাড়ির প্রবেশমুখে একটি হাফেজিয়া এতিমখানা খুলেছেন। এছাড়াও ফেনীর বিভিন্ন উন্নয়নকাজে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিছুদিন আগে এ আসনের সাবেক এমপি যিনি বর্তমানে ঢাকায় নির্বাসিত জয়নাল হাজারী ইকবাল সোবহানকে নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে সার্বিক সহযোগিতা ও কেন্দ্রের সমর্থন আদায় করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে ইকবাল সোবহানের প্রস্তুতি অনেকটা জোরেশোরে চলছে বলে মনে করছেন অনেকে। জানতে চাইলে মুঠোফোনে আলাপকালে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিলে তিনি ফেনী সদর আসনে আবারো প্রার্থী হবেন। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত ফেনী তার অঙ্গীকার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিএনপি : ফেনী সদর আসনটি বিএনপির দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। এ আসনে দুই জয়নালের লড়াই চলতো বছরজুড়ে। বিএনপির ভিপি জয়নাল আর আ.লীগের জয়নাল হাজারী রাজনীতির মাঠে ছিল সমানে সমান। দুজনই ছিলেন বড় দুই দলের সাাধারণ সম্পাদক। দুই নেতার দাপুটে বিচরণে ফেনীর রাজনীতিতে বছরজুড়ে রাজনৈতিক জমজমাট কর্মসূচি থাকতো। ফলে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত ছিল। ১৯৯৬ সালে জাসদ থেকে ফেনী জেলা বিএনপিতে যোগ দেন ফেনী সরকারি কলেজের ভিপি অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন। এর আগে ১৯৮৮ সালে জাসদ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির পরাজয় এবং ভাঙনের সূত্রপাত শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। এরপর থেকে জেলা বিএনপি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। জেলার কিছু নেতার ইন্ধনে ফেনী বিএনপিতে বিভাজন আর বিভেদের রাজনীতির সূচনা করেন খালেদা জিয়ার ভাই সাইদ ইস্কান্দার। এর অংশ হিসেবে ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর ফেনী জেলা বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই থেকে ফেনীতে বিভাজনের রাজনীতির শুরু। ফেনী-৩ আসনের এমপি মোশারফ হোসেন সভাপতি ও ভিপি জয়নাল সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে তাদের বাদ দিয়ে জেলা কমিটি করে বিএনপি নেত্রীর ভাই সাইদ ইস্কান্দার। কমিটি ভেঙে দিয়ে ভিপি জয়নালকে রাজনীতির মূল স্রোত থেকে পৃথক করে দেওয়া হলো। এতে ফেনীর মাঠে ভিপি জয়নালের শূন্যতা তৈরি হলো তাতে দৈন্য নেমে এলো জেলা বিএনপিতে। নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে গেলো প্রবহমান স্রোতের ২টি ভিন্ন ধারায়। এতে বিএনপি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে লাগলো। ১৯৯৬-র নির্বাচনের পর বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায় ক্ষমতাসীন আ.লীগ। এই সময় এক রাজনৈতিক মামলায় হাজতবাসে যান ভিপি জয়নাল। হাজতবাস শেষে ২০০১ সালের নির্বাচনে সদর আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। নির্বাচনে বিপুল ভোটে আ.লীগ প্রার্থী জয়নাল হাজারীকে পরাজিত করে ফেনীতে রেকর্ড গড়েন। জয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও। এসময় আ.লীগ প্রার্থী, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ফেনী জেলা বিএনপি তথা রাজনীতির মাঠের প্রবীণ এ নেতা বর্তমানে বিএনপি নেত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন। নির্বাচনসংক্রান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেন, দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন। ২০০১ সালে কারাবরণ করেছেন। এ আসন থেকে তিনি ৩ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী নির্বাচনে দল অবশ্যই তাকে মনোনয়ন দেবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। এ বিষয়ে জানতে দলের তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীর সাথে আলাপকালে তারা বলেন, ভিপি জয়নাল একজন বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সফল সংগঠক। যিনি এর আগে ৩ বারের সফল এমপি। তিনি দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তার মতো কোমল হৃদয়ের মানুষ রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব কম দেখা যায়। তিনি দলের জন্য জীবনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। দলের জন্য সারাটা জীবন আন্দোলন সংগ্রাম করে শ্রেষ্ঠ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি দলের জন্য অনেক করেছেন সে বিচারে ফেনী সদর আসনে তার বিকল্প অন্য কাউকে চিন্তাই করা যায় না। দল ভিপি জয়নালকে মনোনয়ন দেবে এটা আমাদের বিশ্বাস। এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় আসনটি চলে যায় আওয়ামী লীগের দখলে। ভোট ছাড়াই এখানে সাংসদ নির্বাচিত হন নিজাম হাজারী। এবার সে রকম হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে নির্বাচন হলে এখানে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপা : ফেনীর স্টারলাইন গ্রুপের এমডি ও জাপার কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাজী আলাউদ্দীন জেলা সভাপতি মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমসহ পূর্ণাঙ্গ কমিটি আ.লীগে যোগ দিলে ফেনী জাপায় নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি হয়। তখন জেলায় জাপার এমন দুঃসময়ে নতুন কমিটিতে এগিয়ে আসেন কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক যিনি জেলা কমিটির বর্তমানে আহবায়ক রিন্টু আনোয়ার, সদস্য সচিব ইঞ্জি. খন্দকার নজরুল ইসলাম। ইতোমধ্যে জাপা থেকে এ আসনে ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার নজরুল ইসলামকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তিনি ফেনীর কৃতী সন্তান ও একজন সফল ব্যবসায়ী। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে একক প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ফেনী-১ আসন থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে ফেনীবাসীর জন্য কিছু করে যেতে চাই।
জামায়াত : নির্বাচন কমিশন দলের নিবন্ধন বাতিল করলেও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঞা জোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এদিকে জামায়াত-বিএনপির ব্যানারে নয়, জোটের প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন জেলা জামায়াতের সভাপতি মাও. একেএম শামছুদ্দিন।

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/মিতু

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.