বুধবার ১২ বৈশাখ, ১৪২৫ ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ বুধবার

চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের প্রস্তুতি চলছে ঘরে ঘরে

রনজিৎ মোদক: মহাকালের গর্ভে প্রাকৃতিক নিয়মে পুরনো বছর এভাবেই হারিয়ে যায়। নতুন করে বাঁচার চেতনায় মানুষ নতুন হিসেব-নিকেশ করে। ‘বর্ষ হয়ে আসে শেষ, দিন হয়ে এলো সমাপন, চৈত্র অবসান/গাহিতে চাহিছে হিয়া পুরাতন ক্লান্ত বরষের/সর্বশেষ গান’… বাংলা বর্ষ নিয়ে এভাবেই লিখেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আবহমান বাংলার ঘরে ঘরে প্রাচীনকাল থেকে মমতা-ভালোবাসা আর উচ্ছ্বলতায় পালিত হয়ে আসছে এ প্রাণের উৎসব। বাঙালিজাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যের বন্ধনে পুরনো বছরের দিনযাপনের শত জরাজীর্ণ ধুয়ে-মুছে, আনন্দময় নতুন দিনের প্রত্যাশায় উদযাপন করছে এসব লোকাচার।

দেশের শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সবাই মেতে উঠেছে নতুন দিনকে বরণের আশায়। ‘চিত্রা নক্ষত্র হইতে চৈত্র হইল নাম/বসন্ত বিদায় নিল, বর্ষ শেষ যাম/ চড়কের উৎসব, গাজনের গান/সেই সঙ্গে বর্ষ হইল অবসান।’ সূর্যটা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়তেই কালের গর্ভে বিদায় নেবে ১৪২৪। রবীন্দ্রনাথের শাশ্বত বাণী ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও/তারি রথ নিত্যই উধাও/জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয় স্পন্দন/চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।’ মহাকালের এ রথ এগিয়ে চলছে তার নির্দিষ্ট গতিবেগে। পেছন ফিরে তাকানোর কোনো অবকাশ নেই। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব পুরো জাতি। ব্যর্থতার দায়ভার পুরানের কাঁধে তুলে নতুনের আহ্বানে ব্যস্ত সবাই। জীর্ণ, পুরনো, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধ শক্তি ধুয়ে মুছে যাক, বিদায়ী সূর্যের কাছে এই প্রণতি জানাবে বাঙালি। কিন্তু ফেলে আসা দিন, রাত জাগা পাখি হয়ে হরহামেশাই মনের গহীনে জানান দেবে নিজের উপস্থিতি।

আসছে চৈত্র সংক্রান্তি। ১৪২৪ সনের চৈত্রের শেষ দিন। বসন্তেরও শেষ দিন। বাংলা লোকসংস্কৃতির নানা আচার-অনুষ্ঠানে হাজার বছর ধরে বহমান চৈত্র সংক্রান্তির মূলকেন্দ্র গ্রামবাংলা হলেও নগর সংস্কৃতিতেও এখন এর উজ্জ্বল প্রভাব। নানা আয়োজনে যখন চৈত্র সংক্রান্তির পার্বন, তখন একইসঙ্গে দুয়ারে কড়া নাড়ছে সর্বজনীন উৎসবের নববর্ষ পহেলা বৈশাখ। গ্রামবাংলায় রকমারি সামাজিক আচারের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ যেমন মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং কম্বোডিয়াতে সংক্রান্তির অপর নাম ‘সোংক্রান’। এটি তাদের প্রতিবছর প্রতিপালিত জাতীয় পানি উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ।

বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলা সনের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখের সমান গুরুত্ব নিয়েই পালিত হয়ে আসছে চৈত্র সংক্রান্তি। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে দিনটি পড়ে এপ্রিলের ১৩ তারিখে। চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও নানা পার্বন মনে করিয়ে দেয় নতুন বছর দোরগোড়ায়। এ উপলক্ষে লোকমেলা গ্রামগঞ্জেই বেশি হয়। গানবাজনা, মেলা, নাগরদোলা, প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে লোকজ সংস্কৃতির নানা সম্ভার উঠে আসে এই দিনে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মেতে উঠে নানা পূজা পার্বনে।

তবে সূর্যের কৃপা প্রার্থনায় কৃষককূল চৈত্রমাস জুড়েই এ প্রার্থনা উৎসব করে। বাঙালির ঐতিহ্য অনুযায়ী চৈত্র সংক্রান্তি তাৎপর্য ও গুরুত্ব অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় চড়কপূজার আয়োজন করা হয়। কালের বিবর্তনে চৈত্র সংক্রান্তির গুরুত্ব ও উদযাপন এখন অনেকটা ম্লান। নাগরিক সভ্যতার ডামাডোলে নগরীতে এর আবেদন নেই বললেই চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউড প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও জাঁকঝমক পূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপন করবে। এ জন্য কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন করেছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউড সহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন করেছে।

গ্রামে ও শহরে কিছু কিছু সংগঠন এ ঐতিহ্যকে লালন করে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রতিবছরের মতো এবছরও দেশজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি বছরকে বিদায় জানাবে আমজনতা। আমিও বলি “তুমি চলে যাচ্ছো যাও!/কবুতরের ডানা মেলে/নীলাকাশ ছুঁয়ে/শতাব্দীর মালা গেঁথে।”

 

লেখক:শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

ইমেইল-ranjitmodakpress@gmail.com

Categories: বিনোদন,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.