মঙ্গলবার ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ ২০ নভেম্বর, ২০১৮ মঙ্গলবার

আ.লীগ-বিএনপি কঠিন পরীক্ষায়

 

বিষেরবাঁশী ডেস্ক: আগামী ১৫ মে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। কোনো ধরনের আইনি জটিলতা না থাকায় এ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। ফলে গত শনিবার তফশিল ঘোষণার পর থেকেই এই দুই সিটির নির্বাচন ঘিরে দেশের নির্বাচনী রাজনীতি সরব হয়ে উঠেছে। এ নির্বাচনের ব্যাপারে আগে থেকেই ইতিবাচক ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গতকাল দলের পক্ষ থেকে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহীদের আবেদনপত্র নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গত রোববার রাতে বৈঠক করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এর আগে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজা পেয়ে কারাগারে থাকায় এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিল দলটি।

ইতোমধ্যেই গাজীপুর ও খুলনায় নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আরো তৎপর হয়ে উঠেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। মনোনয়ন নিশ্চিত করতে চলছে দৌড়ঝাঁপ ও তদ্বির। বিশেষ করে প্রধান দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি কাকে মনোনয়ন দেয়—সেদিকে তাকিয়ে সবাই। দলীয় মনোনয়নের দিকে তাকিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। শেষপর্যন্ত কে মনোনয়ন যুদ্ধে জেতে তা নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা। এমনকি মেয়র পদে কার সঙ্গে কার জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে তা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে রয়েছে নানা কৌতূহল।

বিশেষ করে এই দুই সিটির নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই নির্বাচনকে দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সূচক হিসেবেও দেখছে দল দুটি। তাই সতর্ক ও বিচক্ষণতার সঙ্গেই দেখছে এই নির্বাচনকে। বিশেষ করে এই মুহূর্তে মাঠের প্রকৃত অবস্থা কি—তা সঠিকভাবে বলতে পারছে না কোনো দলই। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে ঠিক কোন কৌশলে এগোবে দল দুটি- তা নির্ধারণে শেষ মুহূর্তের চিন্তাভাবনা চলছে দুই দলেই। একদিকে আওয়ামী লীগ চাইছে এবার জয় নিশ্চিত করতে; আর জয় রাখতে মরিয়া বিএনপি। এই নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে চায় দুই দলই। পাশাপাশি এই দুই সিটির নির্বাচন ইসির জন্য অগ্নিপরীক্ষা বলেও মনে করা হচ্ছে।

সর্বশেষ নির্বাচনে এই দুই সিটিতে হারে আওয়ামী লীগ প্রার্থী। কিন্তু পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারণে মাঠ পর্যায়ে দলের অবস্থা বর্তমানে বেশ ভালো বলে মনে করা হচ্ছে। সব দলকে নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের সদিচ্ছা ও পাঁচ সিটির মধ্যে দুই সিটির নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ায় নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। বিশেষ করে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ায় এই মুহূর্তে বিএনপি অনেকটাই কোণঠাসা ও মাঠ পর্যায়ে বিএনপি জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, এখন নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীন প্রার্থীরা জয়লাভ করবে। তবে এই নির্বাচনে জয় এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন—দুটোই চায় আওয়ামী লীগ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সবগুলো সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা ছিল সরকারের ও আওয়ামী লীগের অন্যতম লক্ষ্য। অতীতে আমরা তাই করেছি, নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করেছি। ক্ষমতায় থেকেও অতীতে অনেক সিটিতে আমরা হেরেছি। সুতরাং, দলীয় প্রার্থীর বিজয়ই শুধু সরকার ও আওয়ামী লীগের কাছে মুখ্য নয়। রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের কাছে জয়লাভ এবং নির্বাচনে নিরপেক্ষতা দুটোই জরুরি।

অন্যদিকে, এই দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দুই সিটিতেই জয় ধরে রাখতে চায় দলটি। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিটিগুলোর নির্বাচনকে মোক্ষম সুযোগ ধরে নিয়ে সরকারের বিপক্ষে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। সরকারি দলের জন্য এ নির্বাচন একটি টেস্ট কেস হলেও বিএনপি লক্ষ্য সরকারকে জনবিছিন্ন প্রমাণ করা। গত রোববার দলের জাতীয় কমিটির বৈঠকে অনেক নেতা নির্বাচনের বিপক্ষে কথা বললেও দলটির হাইকমান্ডের আগ্রহের কারণেই সিটি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। তবে নির্বাচন কতটুকু কার্যকরী হবে, বিরোধী দলকে কতটুকু সুযোগ দেওয়া হবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তারপরও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার জন্য এবং জনগণের অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।

গাজীপুরে দুই দলেই একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী : এই সিটিতে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী। এখানে সরকারি দলের বড় ভয় দলীয় কোন্দল, বিভক্তি ও বিরোধ। স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, প্রার্থী নির্ধারণে ভুল বা দলীয় কোন্দল রেখে মনোনয়ন দিলে এবারও ২০১৩ সালের নির্বাচনের মতো পরাজয় হতে পারে দলের। অন্যদিকে, গত নির্বাচনের মতো এবারও এবারও আওয়ামী লীগের বিভক্তি বা কোন্দলের সুবিধা নিতে চায় বিএনপি।

গত নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এম এ মান্নান লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খানকে পরাজিত করেন। যদিও মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি গত পাঁচ বছরের অধিকাংশ সময় মামলা, বরখাস্ত হওয়া ও জেলে ছিলেন। মেয়রের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। এম এ মান্নান বর্তমানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এবারও আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন। এরা হলেন- টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান, গাজীপুর সদর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম এবং মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল হাসান সরকার রাসেল। এ ছাড়া আরো কয়েকজন নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত আজমত উল্লাহ খান মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় নেতাদের মতে, দীর্ঘ সময় আওয়ামী রাজনীতির নেতৃত্ব দেওয়ায় জেলা ও মহানগর জুড়ে আজমত উল্লাহ খানের বহু কর্মী-সমর্থক রয়েছে। আলাদা ভোটব্যাংকও আছে তার।

অন্যদিকে, গতবারের মেয়র এম মান্নান এবার নির্বাচনে প্রার্থী থাকার কথা বললেও তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যপারে খুব একটা মনোযোগী নন বলে জানায় দলীয় একটি সূত্র। তাছাড়া তিনি বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। তার অবর্তমানের সুযোগটি নিতে চায় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার। দলে অন্য আরো তিনজন প্রার্থীর নাম শোনা গেলেও বেশি আলোচনায় রয়েছেন এই দুইজনই।

এছাড়া জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য কোনো মেয়র প্রার্থীর তৎপরতা এখনো দেখা যায়নি। জামায়াতে ইসলামী মেয়র পদে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। জাসদ (ইনু) থেকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলের গাজীপুর মহানগর সভাপতি রাশেদুল হাসান রানার নাম শোনা যাচ্ছে।

খুলনায় হেভিওয়েট প্রার্থী বেশি : এখানেও প্রচারণায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী। সর্বশেষ ২০১৩ সালের জুনে খুলনা সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেককে প্রায় ৬১ হাজার ভোটে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি। এখানে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক এমপি, সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম, নগর যুবলীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান পপলু ও দৌলতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ আলী। পাশাপাশি গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আবদুস সালাম মুর্শেদী ও খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমানের খুলনা সিটির মেয়র প্রার্থী হওয়ার নতুন সমীকরণ চলছে। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত তালুকদার আবদুল খালেক মনোনয়ন লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, বর্তমান মেয়র ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি নির্বাচনী গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা নিজের প্রার্থিতার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। এদের মধ্যে মনিরুজ্জামান মনি ফের প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে আছেন।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ফরম সংগ্রহের আহ্বান : নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আবেদনপত্র সংগ্রহ করার আহ্বান জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। গত রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী ৫ ও ৬ এপ্রিল বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দলের সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে দলীয় মনোনয়নের আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে ও আবেদনপত্র আগামী ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে একই জায়গায় জমা দিতে হবে।

পোস্টার-বিলবোর্ড সরাতে নির্দেশ : এক সপ্তাহের মধ্যে এই দুই সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম প্রচারণামূলক সব ধরনের নির্বাচনী সামগ্রী আগামী ৮ এপ্রিলের মধ্যে নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিতে বলেছে নির্বাচন কমিশন। গত শনিবার তফসিল ঘোষণার পরে সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশনা দেয় কমিশন।
বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/মিতু

Categories: রাজনীতি

Leave A Reply

Your email address will not be published.