বুধবার ৪ আশ্বিন, ১৪২৫ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বুধবার

একাত্তরের স্মৃতি

জার্নি টু আগরতলা
পর্ব – ১

  • গৌতম রায়
    ———————–

সেই দিন এলো আবার। ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। এ দিনটি এলেই স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করে ১৯৭১। আমি ছিলাম ২য় শ্রেনীর ছাত্র। ‘৭০ এর নির্বাচন থেকেই সবকিছু মনে আছে। তবে কালের আবর্তে স্মৃতিভ্রম হয়েছে অনেক কিছুই। বাবা নিয়মিত বিবিসি ভয়েস অব আমেরিকার খবর শুনতেন। বাবা রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন বলেই হয়তো আজো আমি বেঁচে আছি।
দেখেতে দেখতে কতগুলো বছর হয়ে গেল। শিশু বয়স থেকে ক্রমশ: বার্ধক্যে এগিয়ে যাচ্ছি। তবু মনে হয় একাত্তর তো সেদিন গেল। ভাবছি বয়সটা সেদিন কেন আরো ১০টা বছর বেশী ছিল না বা ১০ বছর পরই না হয় যুদ্ধটা হতো। তাহলে অন্তত: একটা নরপশুকে তো মারতে পারতাম। দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ তো করতে পারতাম। একাত্তরের যুদ্ধ আমি দেখিনি। আমি দেখেছি শুধু নরপিশাচদের তান্ডবলীলা। ঘুমন্ত নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া পাক হানাদারের পৈশাচিকতা। ওদের মৃত্যু উল্লাস। মৃত্যু উপত্যকা পূর্ব পাকিস্তান। সেই অসভ্য বর্বর পাক জাতটাকে আজো আমি ঘৃনা করি। আমি ওদেরও ঘৃনা করি যারা বাঙ্গালী হয়েও সেই খুনী জাতির জন্য কান্নাকাটি করে। পরাজিত বিতাড়িত পাকিস্তানীদের জন্য একজন দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীরও তো কোন আবেগ, সহমর্মিতা থাকার কথা নয়। সেদিন ধর্মের দোহাই দিয়ে ওরা যে অপকর্মগুলো আমাদের উপর করেছে সেগুলো কোন ধর্মই সমর্থন করে না। মুসলমান হয়ে মুসলমানের প্রতি এত নিষ্ঠুরতা যারা চালিয়েছে আজ আমরা কি তাদের শুধু মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই বলে বুকে জড়িয়ে নিতে পারি? চোখ বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সেদিন যেভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে সেদিন কি এই নরাধমরা বুঝেনি ওরা আমাদের মুসলিম ভাই। ওদের মারা যাবে না। ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানীর সময় কি মনে ছিল না এরা আমার মুসলিম মা বোন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে কতজন অমুসলিমকে ওরা হত্যা করেছে? যা মেরেছে এর বেশীর ভাগই তো মুসলমান। তাহলে আজ শুধু মুসলমান হিসাবেই কেন ওদের জন্য আমাদের এত দরদ জাগে? কিন্তু অনেকে মনে করে এত বছর পর সেই পুরানো বিষয় ঘেঁটে আর কি লাভ? আমি বলব, এ প্রকৃতির মানুষগুলো হয়তো কৌশলে ইতিহাস থেকে দৃষ্টি সরাতে চায় নয়তো অন্যকোন অভিসন্ধি আছে। কিন্তু আমার স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, একাত্তরের ঘটনার জন্য পাকিস্তান বিরোধীতা করতে কাউকে আওয়ামী লীগ করতে হয় না। আর ভারত বিরোধীতা করার জন্য অসভ্য পাকিদের পক্ষ নেয়াও বোকামী। আবার পাকিস্তানকে সমর্থন করলেই যে কেউ রাজাকার হয়ে যায় না। হয়তোবা হতে পারে সে রাজাকারের উত্তরসূরী।

Image may contain: one or more people and outdoorআমি জানি যাদের বুকে আজ পাকিস্তানী প্রেম জেগে আছে ওরা নর ঘাতকের উল্লাস দেখেনি, ওরা যুদ্ধের সেই বীভৎস্য দিনগুলো দেখেনি। ওদের জন্ম হয়েছে যুদ্ধের পর নতুবা হানাদারের কোন দোসরের উত্তরসূরীও হতে পারে। আমি জানি ওরা বুঝতে চায় না ঐ নরপশুরা সেদিন কি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এই সোনার বাংলায়। কিন্তু আমার চোখে আজো ভাসছে শত শত লাশ। হাজারো শকুনের আনন্দ উল্লাস। শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খাওয়া বাঙ্গালীর মৃতদেহগুলো। পথে পথে পঁচা পুঁতি দুর্গন্ধ।
না, এসব কোন গল্প উপন্যাসের কথা নয়। নয় কারো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। আমিই সেই বর্বরতম ইতিহাসের চাক্ষুষ স্বাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদারের নৃশংসতা তো নিজের চোখেই দেখেছি। ২৫ মার্চ রাত এগারটা থেকে কারফিউ দিয়ে মানুষকে ঘরে আটকে আগুন দিয়ে, গুলি করে মারা হয়েছে। ইতিহাসের সেই হিটলারের ইহুদী নিধনের চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল একাত্তরে পাকিস্তানী কর্তৃক বাঙ্গালী নিধন। ২৫ মার্চ আনুমানিক বারটার পর পরই বাবা ও আশে পাশের লোকজন সবাই বুঝে গেছে, দেশে ভয়াবহ গন্ডগোল শুরু হয়ে গেছে। আর এক মুহুর্ত থাকা যাবে না। বন্দরের বাড়ীঘরে আগুন জ্বলছে। আমাদেরও আগুনে পুড়ে মারা হবে। সারারাত কারফিউ। কারফিউ ভেঙ্গেই যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পালাতে হবে। কিন্তু পালাবে কোথায়? সারা বাংলাই তো জ্বলছে আগুনে। বাবাকে বললাম- বাবা আমরা যাবো কোথায়? বাবার উত্তর- জানি না, কিন্তু আর এখানে থাকা যাবে না। মৃত্যু আতংকে আতংকিত আশে পাশের মানুষকে বলতে শুনেছি- মুজিবকে ভোট দিয়ে আজ আমরা এই বিপদে পড়েছি। বিপদে মানুষ কতকিছুই বলে। সবার সামনেই তখন এক অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যত। কেউ জানে না কার কি পরিনতি হবে। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একবার দেশ থেকে পালিয়েছি আমরা। দাঙ্গার মাঝেই আমার পৃথিবীতে আসা। তারপর ৭ বছর পর আবার পালাচ্ছি। হালকা ব্যাগে কাপড় চোপড়, চিড়া মুড়ি নিয়ে পায়ে হেঁটে রাতের অন্ধকারে কারফিউ উপেক্ষা করে দলবেঁধে আমরা বেরিয়ে পড়লাম অজানার পথে। দেখামাত্রই আমাদের গুলি করে মারা হবে। পেছনে পড়ে রইল আমার স্কুল খেলার সাথীরা। আমার প্রিয় খেলনাগুলো নিতে দিল না বাবা। সারারাত হাঁটছি। সবার ছোট ভাইটি তখন মায়ের কোলে। এখন বয়স ওর ৪৮. মনে আছে মধ্য রাতে এখানে সেখানে আগুনের লেলীহান শিখা, মানুষের আর্তনাদ আর ক্ষনে ক্ষনে গুলির শব্দ শুনছি। শব্দ পেলেই অন্ধকারে গাছের আড়ালে সবাই লুকিয়ে পরতাম। বাবার ভয় আমাকে নিয়ে। বার বার বলছিল কোন শব্দই করবি না। মুখ চেপে বলতো- খবরদার জয় বাংলা বলবি না। ওরা গুলি করবে। রাতের আঁধারেও মানুষের আর্তনাদ আর ছোট্ট শিশুর কান্না শুনেছি। হয়তো শিশুর মাকে মেরে ফেলা হয়েছে নয়তো বুকের মানিককে ফেলেই কোন মা পালিয়ে গেছে। বিপদে পড়লে কেউ কারো নয়। দূর থেকে পাক আর্মিদের গাড়ীর আলো দেখলেই ভয়ে সবার বুক শুকিয়ে যেত। পিপাসার্ত মানুষকে ড্রেনের ময়লা পানি খেতে দেখেছি। নিজেরাও খেয়েছি… (চলবে)

  • প্রতিক্রিয়া: সুভাষ সাহা

Image may contain: সুভাষ সাহা
দেশান্তরির মিছিলে আমিও ছিলাম ভাই বোনেরা একসঙ্গে।নারায়ণগঞ্জ থেকে এক কাপড়ে নৌকায় গ্রামের বাড়ী। তারপর ২০ মাইল পায়ে হেঁটে আগরতলায়। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা!
প্রথমে আত্মিয়ের বাসায় ১ মাস।পরের ৮ মাস কাটাই হাফানিয়া ক্যাম্পে। সেখানে থেকে গণসংগীত দল গঠন করে ক্যাম্পে ক্যাম্প ঘুরে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করি। সন্ধার পর মুক্তিযোদ্ধাদের এ্যামুনেশান,একস্লুসিভ বক্স মাথায় করে বর্ডার পার করে দিই। স্বাধীন দেশে ফেরার সময় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা সনদও নিয়ে আসি।
কিন্তু সরকারী দপ্তরে নিবন্ধন করাইনি।
১৯৬৪ ও ১৯৭১ দু’বার দেশ ছাড়ি। নিঃস্ব হয়ে যাওয়া-নাড়ির টানে দু’বারই ফিরে আসা। খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। এক জীবনে লড়াই করে টিকে থাকার গল্পটা এতো দীর্ঘ হবে কখনো ভাবিনি!

★নিচে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার সনদপত্রটি পুরনো ফাইলে অযত্নে মলিন★

বিষেরবাঁশী ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

Categories: জাতীয়,সারাদেশ

Leave A Reply

Your email address will not be published.